বেদনাময় এক নতুন পৃথিবী

মৃধা আলাউদ্দিন
ভয়ঙ্কর এক মরণ ব্যাধি সারা পৃথিবীর মানুষকে ঘরবন্দি করেছে। এই বন্দি মানুষদের মধ্যে আমিও একজন। অফিসের কাজও স্বল্প পরিসরে, ঘুছিয়ে এনেছি। টুকটাক যা করি তা মোবাইল, ফেসবুক ও মেইলেই করি। বাকিটা সময় কাটে বইপত্র, টিভি আর অনলাইনে পত্রিকা পড়ে। বলা যায়, মোবাইল ও অনলাইনই আমাদের জীবনকে কিছুটা হলেও সচল ও সুন্দর রেখেছে। ভয়ঙ্কর এই মরণ ব্যাধি, করোনার মধ্যেই আমরা কাটিয়েছি আমাদের বর্ষবরণ ও ঈদ। এমন নীরব-নির্জন বর্ষবরণ ও ঈদ আমার জীবনে আর দেখিনি। কোথাও কোনো উৎসব ছিল না। চারদিকে ছিল শুধু ভয় ও আতঙ্ক। সবাই বাসায় বসে কাটিয়ে দিয়েছি ঈদ।

প্রতিটা মানুষেরই একটা আলাদা জগৎ আছে। দুনিয়া আছে। আমারও আছে। আমার এই দুনিয়ায় বসে করোনার কঠিন সময়গুলো পার করছি। আমার বারান্দার আছে কিছু ফল, ফুল ও লতাপাতার গাছ। আছে এক জোড়া তিতিরÑ যা এবার ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা দিয়েছে। এদের দেখাশোনার সময় আগে তেমন পেতাম না। এখন প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় এদের জন্য আমি বরাদ্দ রেখেছি। মোবাইল, কম্পিউটার আর আমার ছোট্ট লাইব্রেরিটা না থাকলে, আমার কী হতো তা আমি নিজেও জানি না। বিধাতাই ভালো জানেন। পরিবারের সবাইকে কাজের জন্য আগে যে সময়টা দিতে পারতাম না, এখন তাদের যথেষ্ট সময় দেয়া যাচ্ছে। দিচ্ছি। লাইব্রেরি ওয়ার্ক করেই বেশি সময় কাটাই। বই পড়ি। লেখালেখি করি। পেন্সিল দিয়ে আঁকিবুকি করারও কিছুটা অভ্যাস আছে।
২.
আমরা কেউই এমন অধৈর্যময় মন্দা পৃথিবী আশা করিনি। আমার দেশ, বিশ্ব একটা বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে গেল। আমার মনে হচ্ছে, একটা দুর্ভিক্ষ হড়বড় করে চলে আসছে আমাদের সামনে। আমরা যেনো প্রস্তুত থাকি। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বলেছিলেন, ‘দেখ উন্মাদ তোর জীবনে শেলীর মতো, কীটসের মতো খুব বড় একটা ট্র্যাজেডি আছে। তুই প্রস্তুত হ।’ এখন আমাদের প্রস্তুত হওয়ার সময়। বদলে যাওয়ার সময়। আমরা আর খোয়ারের বন্দি জীবন চাই না। আমাদের সামনে সবকিছু বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। এ সহ্য করা যায় না। তবে এ কথাও সত্য, সংকট যতই দীর্ঘায়িত হোক, মানুষ ঠিকই তার উৎরণের পথ খুঁজে বের করবে। বিপন্ন সময়ের মানসিক যন্ত্রণা পেরিয়ে সোনালি আলোয় ভরে উঠবে আমাদের পৃথিবী। ভয়কে জয় করে বেঁচে থাকার নামই মানুষ। এই মরণব্যাধি করোনাকে নিয়েই আমাদের এগুতে হবে। তবে এখন সচেতন ও সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কেননা, শত্রুকে পরাজিত করাই মানুষের স্বভাব। করোনা পৃথিবীর সবল-দুর্বল সবাইকে এক কাতারে এনে দাঁড় করে দিয়েছে। এই করোনা যুদ্ধের পর পৃথিবীটা আর আগের মতো থাকবে না। বিশ্বায়ন সংকুচিত হবে। আসবে বেদনাময় এক নতুন পৃথিবী।
৩.
শুধু আমাদের নয়, পৃথিবীর কোনো মানুষেরই এই অভিজ্ঞতাটা এর আগে ছিল না। এটা একটা আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা। প্রায় আড়াই মাস ধরে আমরা সবাই ঘরেই বন্দি হয়ে আছি। এই বন্দি বিষয়টাকে প্রথম আমাদের সবারই দিকে মানিয়ে নেয়া বেশ কষ্টকর ছিল। কিন্তু আমরা যখন বুঝলাম, এভাবেই ঘরে থাকতে হবে। নিজের নিরাপত্তার জন্য, পরিবারের নিরাপত্তার জন্য এবং দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য। তখন আমরা এটাকে কষ্ট হলেও মানিয়ে নিলাম। শুরু করলাম ঘরে বসে নানা কাজের সঙ্গে পড়াশোনা। পড়ে ফেললাম অনেক বইপত্রÑ নজরুল সমগ্র থেকে আবার নতুন করে কিছু কিছু কবিতা পড়লাম, পড়লাম রবীন্দ্রনাথের গোরা, কবি ফররুখ আহমদের নৌফেল ও হাতেম, শাসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথম প্রকাশিত জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, হুমায়ুন আজাদের কবিতা। পড়লাম রফিক আজাদ, মাসুরুর আরেফিনের উপন্যাস আলথুসার ও ঈশ্বরদী, মেয়র ও মেউলের গল্প, রাজু আলাউদ্দিনের অগ্রন্থিত সৈয়দ মুজতবা আলী, মুস্তাফিজ শফির বিরহসমগ্র, মঈনদ্দীনে মুসলিম বীরাঙ্গনা, আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতার বই দ্য প্রফেট, নান্দীপাঠ-সংখ্যা চার থেকেও দুচারটা প্রবন্ধ পড়লাম। ইংরেজি ভালো না জানলেও পড়ে ফেলেছি তরুণ কবি শায়রা আফ্রিদা ঐশীর অল দ্য কোয়েট প্লেসেস।
হোমা কোয়ারেন্টাইনের এই বন্দি অবস্থায় আমি ঘরে বসে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু ব্যায়াম করি। যেমন : জ্যাপিং জ্যাকস, হাই নি, পুশ আপস, ওয়াল সিট, স্টেপস আপস, স্কোয়াস, ক্রানসেস (একা করা খুব কষ্টকর হয়, অন্য আরেকজন পায়ের ওপর দাঁড়ালে ব্যায়ামটা সহজ হয়)। এতে করে আমি নিজেকে বেশ ভালো রেখেছি বলেই আমার মনে হয়।
৪.
ছেলেবেলা থেকে আমরা ঠিক যেভাবে বেড়ে উঠেছি, যেভাবে আমাদের সময় এবং জীবনটা কেটেছে গেছে। এখন ঠিক বুঝতে পারছি না আমাদের সামনের পৃথিবীটা কীভাবে চলবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চলাফেরা থেকে শুরু করে সব কিছুতে একটা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। সব কিছুর সঙ্গে অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটবে। এখন আমরা বিষয়টা হয়তো টের পাচ্ছি না। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা সবই টের পাবো।। যেমন এখন বাইরে যেতে হলে পোশাক পরিবর্তন করতে হচ্ছে, আবার বাহির থেকে ফিরে এসে আবারো পোশাক পরিবর্তন করতে হচ্ছে। গোসলখানায় ঢুকে কেউ গোলস করে ফেলছি। কেউ কেউ আধা গোসল করছি। এরপর আমি ব্যক্তিগতভাবে যা করি, তা হলোÑ গরম পানির সাথে পুরো একটা লেবু টিপে নেই। একটু লবণ, মধু, একটা দারচিনি, সামান্য আদার রস ও কালোজিরার তেল মিশ্রণ করে এক গ্লাস পানি পান করে ফেলি। মনে করি, বাইরে থেকে আমি যে জীবাণু ঘরে বয়ে আনলাম, তা শেষ হয়ে গেল। এখন হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক আমাদের নিত্যসঙ্গি। এটা একটা অভ্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সামনে আরো ব্যাপকভাবে এ অভ্যাস আমাদের জীবনে ঢুকে যাবে। আমরা বদলে যাবো। অর্থাৎ, সেই কবিতার মতো করেই বলতে হচ্ছেÑ সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে।
৫.
আগে আমরা রাস্তা ঘাটে, যেখানে-সেখানে থুথু ও হাঁচি-কাশি দিতাম। কোনো শিষ্টাচার মানতাম না। এখন তার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। প্রকৃতিতেও প্রচুর পরিবর্তন আসবে। লাকডাউনে আমরা দেখেছি কোথাও কোনো গাড়ির হর্ন নেই, ফলে শব্দ দূষণও ছিল না। বদলে গেছে আমাদের বুড়িগঙ্গার পরিবেশ। চাঁদপুর বা দেশের অন্যান্য চরাঞ্চল, বনবাদাড়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর সব সাপ। পশু-পাখি। নেটের সাহায্যে দেখেলাম সাগরের ডলফিন থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রাণীদের স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। বিশ্বের কোথাও কোথাও দেখো গেছে বাড়ি ও উঠানে বন্য পশুÑ সাপ, হরিণÑ রাস্তায় উঠে এসেছে বাঘ ও সিংহসহ আরো ছোট বড় নানা বন্য প্রাণী। আমাদের দেশে, বাইরে প্রকৃতিতে দেখেছিÑ গাছ পালাসহ সব কিছুর মধ্যে একটা প্রচণ্ড সজীবতা। এটা আমরা আগে কখনো কল্পনাই করতে পারিনি। আমাদের রমনা পার্ক, রোটানিক্যাল গার্ডেন, রাস্তার দুপাশগুলো সবুজে ভরা যা আগে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। এটা প্রকৃতির জন্য খুব আশীর্বাদ। নিঃসন্দেহে প্রকৃতি এখন মহাখুশি। প্রকৃতিরও জীবন আছে। প্রকৃতিও তো সব বোঝে। জানে। একটা গাছ কাটলে সে কষ্ট পায়। আপনি লজ্জাবতী লতায় হাত দিলে দেখবেন, সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। প্রকৃতির ওপর আমরা যে নির্যাতন, নিপীড়ন করি, সে জায়গা থেকে প্রকৃতিও করোনাকালের এই দুঃসময়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা মহা আনন্দের জায়গায় খুঁজে পেয়েছে। আমাজন, নায়েগ্রা জলপ্রপাত ও আমাদের সুন্দরবনও বদলে গেছে অনেকখানি। কিন্তু আম্ফান এসে সুন্দরবনকে আবার লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। আসছে ঘূর্ণিঝড় নিসর্গ। ক্ষতি করেছে আমাদের বনের অসংখ্য পশু-পাখি ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষজনের। করোনাকালের এই দুর্বিসহ সময়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোও আর্থিকভাবে হিমশিম খাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডনের মতো দেশ শেষ পর্যন্ত সব কিছু খুলে দিতে বাধ্য হলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে। পৃথিবীর আরো অনেক দেশ অর্থনৈতিক কারণেই লকডাউন তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। আমরা কেবল একটা মধ্যম আয়ের দেশে পা রাখতে যাচ্ছিলাম, ঠিক এই সময়ে করোনার আক্রমণ হলো। ফিরে এলো আম্ফান। নিসর্গ। যা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের ও ভয়াবহ। আমাদের দেশের প্রায় এক কোটির মতো মানুষ বিদেশে চাকরি করেন। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখতে বেশি ভূমিকা রাখত। এই অভিঘাতে এদের অনেকেই বেকার হয়ে যাবে। ফলে সেসব তো বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে একটা অর্থনৈতিক সংকটে ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পরব আমরা। অতএব, এ মুহূর্তে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমাদের আরো গতান্তর নেই। হে আল্লাহ ! তুমি আমাদের মাফ করে দাও।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।