করোনা এবং আমাদের মানসিকতা

জহির ইসলাম
আজ একুশ তম দিন। হোম আইসোলেশনে শেষ দিন। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমি বলতে গেলে প্রায় সুস্থ। তবে মনের গভীরে মাঝে মাঝে চিনচিন ব্যথা অনুভব করি যদি এই পরীক্ষা আল্লাহ আবার নেই। তখন পাশ করবো তো? তখন পবিত্র কুরআন মজিদের এই আয়াতটি মনে পড়ে যায়-

“আল্লাজি খালাকাল মাউতা ওয়াল হায়াতা…অর্থাৎ আল্লাহ বলেন আমি সৃষ্টি করেছি মৃত্যু এবং জীবন।” অত্র আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ বান্দা দের বুঝাতে চেয়েছেন যে মানুষ সৃষ্টি করার পূর্বেই তার মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন বা নির্ধারণ করে রেখেছেন তারপরেই হায়াত তথা জীবনের কথা বলেছেন।
তাই মৃত্যু নিয়ে হতাশা হওয়ার কোনো কারণ নেই, সুতরাং যার জীবন আছে তার অবশ্যই মৃত্যু হবে ততে সন্দেহ নেই।

গত ১৪ জুন দিনের বেলায় আমার গায়ে প্রথম জ্বর আসে রাত্রে থেকে কাশি। তখন আমি গ্রাঃডাঃ বন্ধু মফিজুর রহমানের কাছে গেলে সে আমাকে এ্যাজিথ্রোমাইসিন,ডক্সিক্যাপ,ট্রাইলক-১০, পিউরিসাল-২, ডোকোপা ২০০, তুসকপ সিরাপ এবং সারজেল-এই ওষুধ গুলো দেয়। ওষুধ খাচ্ছি। কিন্তু জ্বর কাশি থামছেনা, বেড়েই চলেছে, জ্বর নিয়মিত ১০২/১০৩ লেগেই আছে, জোলাপ দিলে জ্বর কিছুটা কমে কিন্তু কাশি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

১৫ জুন রাতে কক্সবাজার পৌরসভার করোনা সেম্পল সংগ্রহ কারী টিম প্রধান কবি শামীম আক্তার (যাকে আমি বড় বোনের মতোন শ্রদ্ধা করি) কে ফোন দিয়ে আমার বর্তমান অবস্থার কথা জানালাম। তিনি ওষুধ কী কী খাচ্ছি জিজ্ঞেস করলেন। ওষুধের নাম বলার পর তিনি বললেন ওষুধ সব ঠিক আছে। আদা,রসুন, এলাছি,ডালচিনি, লেবু,লবন এক চামচ সরিষার তেল ও চিমটি হলুদের গোড়া দিয়ে গরম পানির ভাপ নাও এবং গরম পানি দিয়ে গলগল করো আর খাও। আলাদা রুমে থাকো,কারো সাথে মিশবে না এন্টিবায়োটিক শেষ করো, এভাবে সাত দিন চলুক। এরই মাঝে ডক্টরস চেম্বারের ম্যানাজার বন্ধু শহিদুল আলমকে ফোন দিয়ে বিস্তারিত জানালাম সে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ঔ ওষুধের সাথে আরও তিনটি ওষুধ ইভেরা-১২,ডি রাইজ-৪০০০০, এবি১ যোগ করলো। শামীম আপার মতো সেও নিয়মগুলো মেনে চলতে বললো। আবার পরামর্শ নিলাম পৌরসভার কর্মকর্তা কোভিড আক্রান্ত বন্ধু মহিনের, সে জোর দিয়ে বললো কিচ্ছু হবেনা, ভালো হয়ে যাবি, ওষুধ খাও, নিয়ম গুলো মেনে চল্। সুস্থ হয়ে যাবি ইনশাআল্লাহ। এই দেখ্ আমি ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠেছি। আল্লাহর উপর ভরসা কর্। মহিনের কথায় কিছুটা সাহস পেলাম। কিন্তু আমার জ্বর কাশি কমছে না বরং আরও বাড়ছে। আস্তে আস্তে ভয়ে ধরলো। চারি দিকে তরতাজা প্রাণ কিছু পরিচিত মুখ আক্রান্ত হয়ে পরপারে চলে যাচ্ছে, যা দেখে পরিবারের সবাই ভেঙে পড়ে। আমিও দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছি কাশি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কারো সাথে কথা বলতে পারছি না। মুখে একদম রুচি নেই। খাবার দেখলেই বমি অাসে। জোর করে মুখে ভাত নিয়ে গরম পানি দিয়ে গিলতে হচ্ছে।

ষষ্ঠ দিন শরীরের কোনো উন্নতি নেই। কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর সভাপতি মহোদয় মুহম্মদ নুরুল ইসলাম এর পরামর্শে নির্বাহী সদস্য এডভোকেট কবি মনজুরুল ইসলাম এর বদান্যতায় তার ছোট ভাই ডাঃ মোঃ নুরুল আলম এর সাথে কথা বললাম ( উনার সাথে আগে থেকে পরিচিত) তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে জানতে চাইলো আমার বর্তমান অবস্থা সাথে ওষুধ কী খাচ্ছি তাও। তিনি আরও তিনটি ওষুধ দিলো সিভিট২৫০,আর জিংক ট্যাবলয়েট। তিনি বললো এন্টিবায়োটিক শেষ হলে, সাথে সাথে একটি পরীক্ষা করে নিও। কোভিড পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা যাবেনা। রিপোর্ট ছাড়া গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা করে ছেড়ে দেবে। পরীক্ষার কথা বলতেই আমি নার্ভাস হয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবছি, যে পরিমাণ ওষুধ খেলাম তাতেও শরীরে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না, নিজেকে ছেড়ে দিলাম একমাত্র আল্লাহর কাছে। আল্লাহকে বলছি–
হে আল্লাহ, জানি তুমিই একমাত্র উত্তম ফায়সালা কারী। জীবন মৃত্যুতে ডাক্তার ও মানুষের কোনো হাত নেই। কিন্তু আল্লাহ মনকে তো বুঝাতে পারছি না, ৪ ও ৫ পাঁচ বছরের দুইটি কন্যা সন্তান প্রতিদিন রুমের দরজায় এসে চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে বলে-
আব্বু- তোমার কী হয়েছে?
আমরা তোমার কাছে আসতে পারবোনা?
তুমি আমাদের কখন আদর করবে?
দাদী এসে অর্থাৎ আমার মা এসে তাদের নিয়ে যায়, আমার মা ও মেয়েদের কান্নায় পুরো বাড়িটাই এক ধরনের মৃত্যু পুরিতে পরিণত হয়। দূর থেকে সন্তানদের কান্নার আওয়াজ, আমার কাছে আসার আকুতি দেখলে হৃদয়টা মুচড় দিয়ে উঠে। স্ত্রী, যে মহিলা বিয়ের দিন পর্যন্ত নামাজ কাজা করেননি। বিয়ে করেছি ছয় বছর হলো কোনো দিন পর্দা ছাড়া বেগানা কারো কাছে যাননি, আল্লাহ আমার মৃত্যুর পরে এদের কী অবস্থা হবে এই ভেবে সারারাত কান্নাকাটি করলাম।

পরের দিন, সপ্তম দিন কবি শামীম আপাকে ফোন দিলাম এবং ডাক্তার নুরুল আলম সাহেবের সাথে কী কথা হয়েছে তা বলার আগেই তিনি বললো, জহির তোমার এন্টিবায়োটিক শেষ হেয়েছে?
আমি বললাম, আপা আজ শেষ হবে, শরীরের কোনো ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে না।
আপা বললো, আজ সকাল দশটায় কক্সবাজার সদরের উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চলে এসে পরীক্ষাটা করে নাও, চিন্তা করো না। আমি থাকবো। আমি কোভিড১৯ পরীক্ষা করতে গেলাম সপ্তম দিন ২০ জুন। ২১ তারিখ রাতে টেকপাড়ার কৃতি সন্তান বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব মাহবুবুর রহমান ভাই ও আমার আরেক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশিষ্ট ছড়াকার মোঃ নাছির উদ্দিন এই দুজনের মধ্যমেই জানতে পারলাম নেগেটিভ। আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু রিপোর্ট হাতে পাচ্ছি না, সিভিল সার্জনে খোঁজ নিলাম ওখানে সবার রিপোর্ট আছে আমারটা নেই। পরে আমার স্কুল, কক্সবাজার কে.জি এন্ড মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধাভজন কে.এম রমজান আলী স্যার কষ্ট করে আমাকে রিপোর্টটি সংগ্রহ করে দিলেন কৃতজ্ঞ স্যারের কাছেও।

সাথে সাথে বন্ধু শহিদুল আলম ও ডাঃ মোঃ নুরুল আলম সাহেবকে জানালাম। ডাক্তার সাহেব বললো, এখন যেভাবে ওষুধ, গরম পানির ভাপ নিচ্ছেন এভাবে চৌদ্দ দিন ঠিক ঠিক চলিয়ে যান। এন্টিবায়োটিক বন্ধ। বাকি ওষুধ চলবে। ডাঃ মোঃ নুরুল আলম সাহেব আরও তথ্য দিলেন যে-এন্টিবায়োটিক, ভাপ নেওয়ার সাত/আট দিন পর যে পরীক্ষাটা সাধারণত নেওয়া হয় সেটা মূলতঃ ফলোআপ পরীক্ষা। তোমার যে সকল উপসর্গ আছে শুরুতে পরীক্ষা করালে কিন্তু পজিটিভ আসতো, তখন মনোবল ভেঙে যেতো। যা করে আল্লাহ ভালোর জন্যই করে। চিন্তা করো না।
বন্ধু শহিদুল আলম ও মহিন তারাও বললো একই কথা। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি অসুখের সূচনাতেই যথা নিয়মে চিকিৎসা করেছিলাম।

দশম দিন জ্বর কমেছে, কাশি ঠিক আগের মতোন। একেকটা কাশিতে আমার হৃদপিণ্ড বেরিয়ে যাওয়ার উক্রম! ডাঃ নুরুল আলম কে ফোন দিয়ে জানলাম উনি এখন চেম্বার করেন না। শেষে সদর হাসপাতালের আরএমও ডাঃ শাহীন আব্দুর রহমান কে সন্ধ্যায় ইউনিয়ন হসপিটালে দেখালাম। তিনি দিলেন-ডোকোপা২০০, প্রোজমা, জাইফ্লো-১০, ও ইনহেলার। সাথে আগের ভিটামিন চলবে।
চলে আসলাম বাসায়, অবস্থা অপরিবর্তিত। গরম পানির ভাপ নিলে একটু ভালো লাগে, দৈনিক চার বার ভাপ নিচ্ছি, গলগল করছি আর খাচ্ছি।

আল্লাহর রহমত বারোতম দিনে কাশিটাও কমতে শুরু করছে। চৌদ্দ তম দিনে কাশি ৫০% কমে গেছে, ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করালাম। আরও সাত দিন থাকতে হবে হোম আইসোলেশনে। মোট একুশ দিন। কাশি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত।

অল্প অল্প খেতে পারছি, অনেক বন্ধু বান্ধব, সহপাঠী, সহকর্মী, কবি সাহিত্যিক খবর নিয়েছেন। নাম উল্লেখ করতে গিয়ে, যদি কারো নাম বাদ পড়ে যায়-তখন অনেকই মন খারাপ করতে পারে সেই ভয়ে কারোর নাম উল্লেখ করছিনা। যারা এই অধমের খবর নিয়েছেন সবার কাছে কৃতজ্ঞ।

এরই মাঝে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো আমার করোনা ভাইরাস।অথচ তখন রিপোর্টও আসেনি। অনেকেই আমদের বাসায় আসা যাওয়া বন্ধ করে দিলো। একই অবস্থা বাইরেও আমার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তেমন কেউ মিশতেছেনা। অথচ আমার গ্রামের শতকরা দশটি পরিবারে জ্বর সর্দি কাশির রোগী রয়েছে, যারা পুরো এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এরা কোভিড ভাইরাস হোক কিংবা সাধারণ ভাইরাস হোক ছড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের মাঝে। কোভিড১৯ কী। সে সম্পর্কে তাদের মধ্যে নুন্যতম কোনো ধারণাই নেই। এদের মাঝে করোনা মানেই এক ধরনের পাপ। যা ইমানদারদের কাছে আসেনা। এটাই বাংলাদেশের জনগণের একটা বড়ো সমস্যা। এদের কারণেই বাংলাদেশ আজ ঝুঁকিতে।

আল্লাহ সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুন। সবাই নিরাপদ থাকুন। সুস্থ থাকুন। আমিন।

লেখক : ছড়াকার ও শিক্ষক

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।