সোভিয়েত বিপ্লবের যুগে কবি আন্না আখমাতাভা (১৮৮৯-১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)

মনির ইউসুফ

রক্ষাকবচ পরি না বুকের ‘পরে
তা নিয়ে কান্না বাঁধি না তো কবিতায়
দুঃ স্বপ্নে সে বাঁচাবে কেমন করে?
সে তো করে নি ক স্বর্গ-শপথ হায়!
হৃদয়ে কখনো ও-কথা দিই নি ঠাঁই :
বিকিকিনি হাটে নে হবে পণ্য মূলে;
রোগে দারিদ্রে হতে পারি মূক, ভাই,
তার কথা মোরা মনেও আনি না ভুলে।
ও যেন জুতোর উপর কাদার দাগ,
ও যেন দাঁতের ফাঁকেতে কাঁকরকণা।
ঝাড়ব, গুঁড়োব, ধুয়ে নেব সব দাগ
জানি মোরা ও তো ধুলোমাটি গুঁড়োসোনা।
শুয়ে রব সেথা, মিশে ওরই বুকে,
পরম আপন তারে তাই বলি সুখে।
(দেশের মাটি-আনা আখমাতাভা, অনুবাদ : হায়াৎ মামুদ)

না, এ কখনো আমি নই, হবে আর-কেউ নির্ঘাত
আমি হলে কি এত সওয়া যেত?-এত সব অপঘাত!
সবই না হয় ঢাকা থাক কালো কাপড়ের তলে,
ঠিক আছে, নিভিয়ে দাও যত বাতি…
এখন তো নিশীথ রাতি
(শবযাত্রীর প্রার্থনাস্তব- অনুবাদ : হায়াৎ মামুদ)

রাশিয়ার মাটিসিক্ত সাহিত্য নিয়ে আমার জানার আগ্রহ ও কৌতূহল অনেক দিনের। যার জন্য যেখানে রাশিয়ান সাহিত্য দেখি সেখানে অচেতনে অজান্তেই মন বুলিয়ে নিই। রাশিয়ান সাহিত্য আমাকে সমৃদ্ধ করে। মানুষ ও মৃত্তিকার ভেতর বাহির হৃদয়ের অনুভব লড়াই সংগ্রাম ঘাম কামসহ পৃথিবীকে নতুন করে অনুভব করতে শেখায়। রাশিয়ান কবিতা আমাকে টেনে ধরে মনোস্রোতের গভীরে। আহা! কবিতা এমন মনোসিক্ত, হৃদয়সিক্ত-মাটিসিক্ত কি করে হয়। সুন্দরের সমস্ত সংবেদন আমাকে মিশিয়ে দেয় রুশী গোলাপের সৌরভ। আমি রাশান ভূচিত্রের, ভূ-বারান্দার সমতলের স্তেপের ঘ্রাণের ঘোরে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। আমার নিমজ্জন আমার দরবেশী ধ্যান আমার নির্বাণ চোখ বন্ধ করে আমাকে দেখতে শেখায় পৃথিবী। ধ্যান শেষ করে চোখ মেলে আমিও পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার জন্য বুদ্ধ, মুহাম্মদ, মার্কসের ইতিবাচক লড়াইয়ে নেমে পড়ি। কবিতা হয়ে ওঠে সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে কার্যকর কথার বানী। না কবিতা কিছুই না, কবিও কেউ না।

এই বারোয়ারি সমাজের কবি তো অপাংত্তেয় এক উসখুসকো মানুষ। যার ক্ষমতা বিমূর্ত। আর সমাজের যারা মূর্তমান ক্ষমতাবান তারা, তারাই কবিদের অপাংত্তেয় করে রাখে। কেননা, কবি জেগে ওঠে যথা সময়ে, মূর্তমান ক্ষমতাবানদের কাছে সৌন্দর্য চেতনা এক বিলাসিতা সরূপ। আর ক্ষমতাবানরা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে চাই। কবি সেখানে খেয়ে না খেয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে ডান বাম যে দিকের ক্ষমতাবানই হোক না কেন। আমরা তা দেখেছি রাশিয়ায়। বিপ্লবের পর রাশিয়ায় কবিদের উপর কি লাঞ্জনা চলেছে- আমরা আনা আখমাতাভার জীবনকে যদি দেখি তাহলে আর কোথাও আমাদের যেতে হবে না। কবি আনা আখমাতাভা। কোনো মতাদর্শের দাস হতে চাননি। এই না চাওয়াটাই তার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। শুধু কি আনা আখমাতাভা, মারিয়া সাতেয়েভানাসহ সের্গেই এসোনিন, মায়াকোভস্কির মত একশভাগ বিপ্লবে নিবেদিত কবিকেও আত্মহত্যা করতে হয়েছে। এ কঠিন বাস্তবতা। রাজনীতির সঙ্গে কবিতানীতির কেন যে সাপনেউলে সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেটা বুঝতে হলে-রাজনীতিটাকেই ভালভাবে বুঝতে হবে।

রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্র ও মতবাদের কায়েমী স্বার্থ। কায়েমী ম্বার্থ পারে না পৃথিবীতে হেন কোন কাজ নেই। কবি সব সময় মানবিক সৌন্দর্যের সাধক। কবি মানবিকতার বরপুত্র। সে কোন কবি! যে কবি হৃদয় ভেঙে মানুষকে ভালোবোসে। মানুষের সুখ-দুঃখ দরিদ্র অভাবের সঙ্গে যে কবি নিজেকে মিশিয়ে দেয়। রাজনৈতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ যে কবির শুত্রু হয়ে ওঠে। যে কবি বুঝতে শেখে তার সময়, তার সাধনা মানুষের কাজে লাগুক। তার ঘাম রক্ত কাম কষ্ট সব মানুষকেই ঘিরে। কিন্তু কবি কোন মতবাদে তার মনকে বন্দি করতে পারে না। আমরা রাশিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কিকে এই উদাহরণে নিয়ে আসতে পারি। এত বড় বিপ্লবী লেখক হয়েও তিনি বলশেভিক পার্টিতে যোগ দেননি। আমার আজকের লেখার বিষয় কবি আনা আখমাতাভা ও তাঁর সময়। কিন্তু তা লিখতে গিয়ে এত গৌরচন্দ্রিকা টানা কারণ কি, পাঠক তা বলতেই পারেন। আনা আখমাতাভার জীবনকে বুঝতে হলে তার সময়, সে সময়ের বিপ্লব, বিপ্লবোত্তর পৃথিবীকে বুঝতে হবে। রাশিয়ার বিপ্লবী রাজনীতিকে বুঝতে হবে।

রাশিয়ার স্বর্ণযুগের কবি পুশকিন থেকে শুরু করে মিখাইল লিয়ের্মন্তফ, আলেক্সান্দর ব্লোক, আনা আখমাতাভা, মারিয়া সাতেয়াভানা, বরিস পাস্তেরনাক, রর্বেৎ রজদিয়েস্ত্ভেনইস্ক, আন্দ্রেয়েই ভজ্নেসিয়েন্স্কি, ইভইগয়েনি এভ্তুশিয়েনক, মায়াকাভস্কি, সের্গেই এসোনিন সময়ের তোলপাড় করা সন্তান। সবাই বিপ্লবের সন্তান। বিপ্লববের আগেও পরে যারা নিবেদন করেছে মানুষের মুক্তির জন্য তাদের পঙক্তিমালা। কিন্তু তারা অনেকেই কোন মতবাদে বন্দি থাকতে চাননি। এই স্বকীয়তা তাদেরকে কবি করে তুলেছে, শুধু রাশিয়ার না পৃথিবীর। বিপ্লবোত্তর পৃথিবীতে কত না যাতনা বুকে তাদের যাপন করতে হয়েছে এই নশ্বর জীবন।

‘আন্না আন্দ্রেইয়েফনা গরিয়েন্ক জন্মেছিলেন রাশিয়ার ওদেসায়, ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন তারিখে। পিতৃপদবি গরিয়েন্ক বাদ দিয়ে ‘আখমাতভা’ নাম নেওয়ার পিছনে ছোট্ট একটু ইতিহাস আছে।’ ইশকুলে যখন পড়ছেন তখনই কবিতা রচনায় হাতে খড়ি। মেয়ে লেখাপড়া পড়ছে শিখছে, সেটাই তো অনেক। তার ওপর আবার পদ্য লেখা! না বাপু, এত বাড়াবাড়ি ভালো নয়। ছাপার হরফে ‘গরিয়েন্কে’ দেখলে সবাই খেপে যাবে, বিরক্ত হবে। ফলে একটা ‘তখাল্লুস’ বা নঁ প্লুম্’ খুঁজে বের করতে হয়। মায়ের দিক থেকে পূর্বপুরুষ ছিলেন তাতার মুসলমান। তাদের একজনের নাম ছিল ‘আহমদ’। রুশ ভাষাবৈগুণ্যে তা হয়ে দাঁড়ায় আখ্মাদ (রুশ ভাষায় হ ধ্বনি অনুপস্থিত); সেখান থেকে আখ্মাত্, অতঃপর লিঙ্গান্তরে আখ্মাতাভা (আমাদের দেশেও তেমন হয় : মাজেদ থেকে মাজেদা, কি বিজয় থেকে বিজয়া, সে রকম)। কোনো এক সময় এদেরই কেউ কোনো কারণে ইসলাম ছেড়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। ’

‘রাশিয়াতে সোভিয়েত শাসন অক্টোবর বিপ্লবের পর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে এই কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-সঙ্গীতজ্ঞ-নৃত্যশিল্পী-মঞ্চশিল্পীদের অবদানে নানা আন্দোলন তৈরি হয়েছিল : সিম্বলিজম, আকলিজ্ম, আকমেইজম্, ফুতুরিজম্, ফিউচারিজম, ইত্যাদি। আলেক্সান্দার ব্লোক, ওসিপ মান্দেল্শ্তাম্, আন্দ্রিয়েই বিয়েলি, ভির্ক্ত শক্লোফস্কি, নিকলাই গুমিলিওফ্, আন্না আখমাতাভা, জিনাইদা গিপ্পিউ্স প্রমুখেরাই এসব আন্দোলনের চালিকা শক্তি ছিলেন।

সোভিয়েত বিপ্লবের যুগে রাশিয়ার কবি ও কবিতা আহত হতে থাকে। বিপ্লব হয়ে যাওয়ার পর কবিদের পৃথিবী নিয়ন্ত্রিত হয়। যতদিন গ্রেট লেনিন বেঁচে ছিলেন ততদিন এ প্রশ্নে কোন কথা ছিল না। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পালটে যায়। সাহিত্যিকদের উপর ব্যাপক আঘাত আসতে থাকে। সে আঘাতের অসহায় শিকার আনা আখমাতাভাও। কবিদের মন সম সময় সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন থাকে। মানে ক্রিয়াশীল থাকে। কেননা, কবিরা বোধ সম্পন্ন মানুষ। সেই ক্রিয়াশীলতার ভেতর দিয়ে কবির জীবন। বিপ্লবীরা যদি কবিদের বুঝতে না পারে তাহলে সে বিপ্লবও ধ্বসে পড়ে। সেই বিপ্লবীদের নিয়ে প্রশ্ন জাগে। সে প্রশ্নে বিস্মিত হয় পৃথিবী। এই সময়ে আনা আখমাভাকে হতে হয় আহত-নিহত। সাম্রাজ্যবাদের পৃথিবীতে-সাম্প্রচারিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা কবিদের যেমন হেস্তনেস্ত হতে হয়, তেমনিভাবে সামাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে কথা না বলে, ঐ মতবাদের প্রশ্নে নিরব থেকেও কবিকে হতে হয়েছে হেস্তনেস্ত। সোভিয়েত বিপ্লবের যুগে সৃষ্টিশীল মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় যে যন্ত্রণা ভোগ করেছে তা তুলনা রহিত এক বাস্তবতা। সোভিয়েত যুগের কিরগিজ স্থানের লেখক চিঙ্গিজ আইয়াৎমাতভ বিপ্লব, বিপ্লবের বিকাশ, বিপ্লবের বিদায় নিয়ে তার ত্রিলজি-উপন্যাসে অসাধারণ মুন্সিআনায় তা প্রকাশ করেন। ‘জামিলা, প্রথম শিক্ষক, বিদায় গুলসারি’। যারা এই তিনটি উপন্যাস পড়েছেন তারা বুঝতে পারবেন মানুষের সুকুমার স্বপ্নে বিপুল বিপ্লব প্রতিষ্ঠা হলো আর কি নিষ্ঠুরতায় মানুষের গড়ে ওঠা মানবিক স্বপ্নের বিনাশ হলো। এক জীবনে বিপ্লবের দেখা পেয়েও সে এক জীবনে তা ধ্বসে যাওয়ার কষ্ট কি রকম ব্যথাতুর- সেই বুঝে যে, এই বিপ্লব প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রম মেধা জীবন উৎসর্গ করেছিল, দিয়েছিল রক্ত। কিন্তু বিপ্লবেরও নিজস্ব স্বার্থ থাকে, কায়েমী স্বার্থ সেটা বুঝা গেল সোভিয়েত বিপ্লবের যুগে। তারাও অন্য মন, মত, সৃষ্টিশীলতাকে রক্তাক্ত প্রক্রিয়ায় দমন করেছে। কিন্তু মানুষ ভেবেছিলো সোভিয়েত বিপ্লবীরা সবকিছু মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করে পৃথিবীতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয়প্রজ কায়েমী স্বার্থ বিপ্লবের পর মানবিক প্রশ্নে যেন অন্ধ হয়ে পড়েছিল। তারাও গতানুগতিক হয়ে উঠেছিল, সাম্রাজ্যবাদী নিষ্ঠুর ক্রুর মানুষের আচরণে আর বিপ্লবীদের আচরণে কোন পার্থক্য দেখা গেল না। মানুষ তার বিপুল স্বপ্ন ও সম্ভাবনাতে আবার দেখলো ধ্বস যেতে।

‘আন্নার বাল্যকালও নিরবচ্ছিন্ন সুখের হয়নি। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, অর্থাৎ বিদ্যালয়-জীবন, ভালোই কাটল; বিন্তু এ বছরই বাবা-মা আলাদা হয়ে যাওয়ার মায়ের সঙ্গে তাঁকে কৃষ্ণসাগরের তীরে এক জায়গায় চলে যেতে হল। এ বছরই রাশিয়ায় ব্যর্থ বিপ্লব ঘটে। কিয়েভের এক ইশকুলে থেকে ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে পাশ করে বেরুবার পর আন্না কিয়েভ্ মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হল আইন পড়ার জন্য। পরে সব ছেড়েছুড়ে সাহিত্য পড়তে আসেন তাঁর প্রিয় জায়গা সাংক্ৎ পিতের্বুর্গেই। কবিতা রচনাই ক্ষান্তি নেই। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে হল নিকলাই গুমিলিওফের সঙ্গে। গুমিলিওফ্ নিজেও কবি, সম্পাদক এবং আন্নার ইশকুলেরই ছাত্র ও ভাইয়ের বন্ধু। প্রেমের বিয়ে, আবার প্রেমের নয়ও বটে। কারণ গুমলিওফ্ বছর তিনেক ধরে অনেক সাধ্যসাধনার পর আন্নাকে রাজি করাতে পেরেছিলেন। আন্না একবার বলেছিলেন, না, তোমাকে ভালোবাসি না, কিন্তু তোমাকে আমি খুবই গুনুত্বপূর্ণ মানুষ বলে মনে করি।’
আন্না আখমাতাভার ব্যক্তিগত জীবন এত গুরুত্ব সহকারে লক্ষ করার কারণ হল সেই সময়কে বুঝতে চাওয়া। রুশ সাহিত্যে এই কালপর্বটি চিহ্নিত হয়ে থাকে ‘রৌপ্য যুগ’ হিসেবে। ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয় কবি পুশ্কিনের সময়কে। রৌপ্য যুগে’র সময়কাল বিশ শতকের প্রথম দু’দশকে ধরা যেতে পারে। মোটামুটিভাবে এই বিশ বৎসর শিল্প ও সাহিত্য বিষয় নানান ধরনের তাত্ত্বিক ধ্যানধারণা ও সৃজনশীলতায় রাশিয়াকে পৃথিবীর সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিল যার সঙ্গে পূর্বগামী শ’দুয়েক বছরের কোনো মিল ছিল না। যে সব সৃষ্টিশীল মানুষ এর পিছনে ছিলেন তাঁরা সবাই কমবেশি উৎকেন্দ্রিক, নিরীক্ষাপ্রবণ, জীবন সম্পর্কে প্রশ্নব্যাকুল, সামজিকভাবে ব্যতিক্রম ও বোহিমীয় স্বভাবের। আখমাতাভা ও তাঁর প্রথম স্বামী গুমিলিওফ্ এঁদেরই অর্ন্তভুক্ত।’

‘পরে আন্নার জীবনে অভিশাপ নেমে আসে। প্রথম স্বামী মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুতণ্ডে দণ্ডিত হন। দ্বিতীয় স্বামী মারা যান যক্ষ্মায়, ছেলেকে বারংবার নানা অজুহাতে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, শেষ যে বার ধরে সেবারে আঠারো বছর শ্রমশিবিরে থাকার পর মুক্তি আসে। আন্নার কবিতা ছাপানোর ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তাঁর চাকরি চলে যায়। সেই দুঃখ থেকে তিনি লিখেন তার বিখ্যাত কবিতা-‘শবযাত্রীদের প্রার্থনাস্তব’ যেমন :

বিশ্বভুবনে আমাদের চেয়ে নেই
অশ্রুবিহীন, গর্বী সরল জাতি
১৯২২

বয়ে চলে ধীরে শান্ত নদীটি দোন
হলুদাভ চাঁদ চেয়ে দেখে’ গৃহকোণ

ঘোমটার তলে মাথাটি হেলিয়ে ঢোকে
হলুদাভ চাঁদ ওকে দ্যাখে ছায়ালোকে

রুগ্ণা অভাগা নারী এক
বড় একাকিনী নারী এক
স্বামী তো কবরে, ছেলেও গরাদে জেনো
একটু করুণা অভাগীর তরে মাগো

০২
না, এ কখনো আমি নই, হবে আর-কেউ নির্ঘাত
আমি হলে কি এত সওয়া যেত?-এত সব অপঘাত!
সবই না হয় ঢাকা থাক কালো কাপড়ের তলে,
ঠিক আছে, নিভিয়ে দাও যত বাতি…
এখন তো নিশীথ রাতি
(শবযাত্রীর প্রার্থনাস্তব- অনুবাদ : হায়াৎ মামুদ)

‘পুরো স্তালিন আমল তার জীবনে দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্ন। কেননা, স্বপ্ন ও কল্পনার জগত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। পার্টি নির্ধারিত সাহিত্য শিল্প যেন এক মোক্ষ আধেয় হয়ে উঠেছিল। আর শুধু চারদিকে ধরপাকড়, নির্বাসন, জেল জুলুম, সন্দেহ-আতঙ্ক। আন্নার বন্ধুরা একে একে দেশ ছাড়ে, যারা থেকে যায় তারা অনেকেই ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রাণ দেয় কিংবা আত্মহত্যা করে। আন্না কিছুই করেন নি, তিনি দেশের ভিতরে থেকেই সব সহ্য করেন। বিদেশে স্বেচ্ছানির্বাসিত বন্ধুবর্গ সকলেই চলে যাওয়ার জন্য ডেকেছিলেন, তিনি শোনেন নি, আত্মপ্রেমের চেয়ে দেশপ্রেম সেখানে প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল।’ ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে যেমন তিনি লিখেন-

অবেশেষে যদি বললেই কথা, মানে
নতজানু নয়, যে-ভাবে শোভন হতো-
বরং সদ্যমুক্ত বন্দী মতো
যে-ভাবে দেখে সে সজল চোখের বানে
ভূর্জবনের পবিত্র ছায়াপানে।

চারদিকে শুধু নৈঃশব্দ্যের গান,
ছায়া কেটে আসে স্বচ্ছ সূর্যকর,
চোখের পলকে পৃথিবী রূপান্তর,
পরিবর্তিত চেনা সে-মদের ঘ্রাণে।
এমনকি আমি- ললাটলিখন যারে
করেছে ঘাতক ঐশী ক্রোধের মারে-
স্তব্ধ দাঁড়াই, চিত্তে শ্রদ্ধাময় :
জীবন আশীর্বাদে যেন ভর করে

‘আন্না আখমাতভার কবিতায় উঠে এসেছে তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা। স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ভেতর দিয়ে সে অর্থে তাঁর কবিতা গীতিময়, আত্মজৈবিনক। তিনি পরিচিত শান্ত মাধুর্যের সৌম্য কোমল লালিত্য নিয়ে অপূর্ব এক কবি হিসেবে।

মস্কোর অদূরে এক স্যানাটোরিয়ামে, রোগমুক্তির পর স্বাস্থ্যোদ্বার গিয়ে, বিনা কষ্টে আখমাতাভার দেহাবসান ঘটে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মার্চ তারিখে। তাঁকে লেনিনগ্রাদে ( সোভিয়েত আমলে সাংকৃৎ পিতের্বুর্গের পরিবর্তিত নাম) নিয়ে গিয়ে সমাহিত করা হয় ১০ মার্চ।’

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক-কবিতার রাজপথ।

রাইজিং কক্সে প্রকাশিত মনির ইউসুফের লেখা পড়ুন

মনির ইউসুফের কবিতা

মনির ইউসুফের কবিতা
মনির ইউসুফের কবিতা
মনির ইউসুফের কবিতা

সময় তুমি অর্থ নও, তবুও কেন দ্রুত ফুরিয়ে যাও

বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার বেদনার সন্তান অনুবাদক জাফর আলম

লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাক নুড়ি

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।