ভিন্নস্বরে ভেজা উপন্যাস : যার কেউ নেই

মৃধা আলাউদ্দিন
কিছু মানুষের সব কিছু থাকার পরও একটি মাত্র অপূর্ণতা বা স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে চারপাশের সাজানো গোছানো জীবনধারা আর পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, নারীদের প্রেম সবকিছুই বিসর্জন দিয়ে পারি জমাতে হয় প্রতিষ্ঠিত হবার প্রতিযোগিতায়। সবার থেকে আলাদা জীবন তৈরি করার নেশায়। নারীরা যখন প্রেমের ফেরিওয়ালা হয়ে আকুতি জানায়, চলার পথের আজীবনের সঙ্গী হবার অভিলাস জ্ঞাপন করে, শুধু ওই একটি অর্জনের নেশায় জলাঞ্জলি দিতে হয়Ñ মেরে ফেলতে হয় সব। দূর দেশে গিয়ে কেউ সেই স্বপ্নের জায়গায় দাঁড়িয়ে, সব নারীর প্রেমের আশায় একাই থেকে যায় আজীবন। সব কিছু থাকর পরও এদের কেউ থাকে না। এই দুই ধরনের লোকেরা যে একই পথের পথিক। এই পথিদের নিয়ে কবি ও আবৃত্তিশিল্পী স্রোত আহমেদ লিখেছেন ‘যার কেউ নেই’ উপন্যাস। উপন্যাসে পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মানুষের মনন চর্চায় যে আবহÑ তাতে শিল্প-সাহিত্যের উৎকর্ষতা ক্রমাগতভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছে। মানুষ তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের এই চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। বস্তুগত ও মননগতÑ উভয়ই সংরক্ষণের নিমিত্তে তার এই নিত্যপ্রয়াস। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মধ্যে উপন্যাস অন্যতম সুন্দর-ষড়ৈশ^র্য, সবলীল, নদীর গতিময়তার মতো একটি শাখা। যার ডান আছে, বাম আছেÑ আছে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম। অর্থাৎ আমরা বলতে চাচ্ছিÑ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক ইত্যাদির পাশাপাশি উপন্যাস সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। পৃথিবীতে উপন্যাস সবচেয়ে বেশি পঠিত হয়। বিশ^সাহিত্যের এর প্রভাব রয়েছে। পাঠক এই উপন্যাসে বেশি তৃপ্তি লাভ করে। উপন্যাসে থাকে পূর্ণাঙ্গ জীবনকথা। সমাজের যাবতীয় বিষয়-আশয়, মানুষের যাপিত জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা ও নিরাশার পরিপূর্ণ অভিব্যক্তি আমরা উপন্যাসে লক্ষ করি। জীবন ও জগতের বিস্তারিত প্রতিচ্ছবি উপন্যাসেই বেশি বিমূর্ত হয়। নিজের জীবনকেও যেখানে স্বচ্ছ আয়নার মতো দেখতে পাওয়া যায়। নিজের ভাবনা চিন্তাও বেশ সাবলীলভাবে অবলোকন করা যায়। অনুভব করা যায় ব্যক্তি মানসের সকল আশা-আক্সক্ষাকার স্বাদ। কেননা, জীবনের পুক্সক্ষানুপুক্সক্ষ বর্ণনা বা আলোচনা শিল্পের অন্য মাধ্যমগুলোতে তেমন একটা পাওয়া যায় না। পাঠক তার মানস গঠন কিংবা সমাজ গঠনের যাবতীয় উপাদান যেখান থেকে আহরণ করার সুযোগ পানÑ সেটা উপন্যাস। স্রোত আহমেদ, লেখকরা নানাভাবেই তাদের চেতনাবোধ ও দর্শনগত ভাবনা উপন্যাসে প্রতিফলিত করেন। আপামর জনসাধারণের মনোভাব কিংবা জনসংস্কৃতির পূর্ণ রূপায়নে তারা সর্বদায় সচেষ্ট। জীবনের নানা অনুষঙ্গ, প্রতিটি মুহূর্তের অনুভূতিগুলো তাই তারা সুচারুভাবে উপন্যাসে লিপিবদ্ধ করে যানÑ
বলছিলাম ভিন্নস্বরে ভেজা একটি নতুন উপন্যাসের কথা ‘যার কেউ নেই’। সম্প্রতি প্রকাশিত এই উপন্যাসটির রচয়িতাÑ দক্ষ কারিগর, পলিময় মাটির গাল্পিক, কবি ও আবৃত্তিশিল্পী স্রোত আহমেদ। তার উপন্যাসটির শিরোনামই বলে দ্যায়Ñ এটি একটি উপন্যাস। ছোট্ট এ উপন্যাসে লেখক কী স্রোত বইয়ে দিয়েছেন সেটাই এখন আলোচ্য বিষয়। শিরোনামটি চোখে পড়লেই এক রকম মায়াবী ভাবনায় আচ্ছন্ন হতে হয়। একটি ছোট্ট নামের ভেতর লুকিয়ে আছে কতোশত, হাজার হাজার গল্প-কাহিনি। আরব্য রজনীর রাজহাঁস। তবে এ কথা সত্য মানুষের যাপিত জীবনকে উপজীব্য করেই লেখা স্রোত আহমেদের এই উপন্যাস। জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো তুলে এনেছেন নিপুণ হাতে। প্রতিটি মানুষের কিছু না কিছু ভাবনা-চিন্তা থাকে। একেকজনের ভাবনা একেক রকম। তাদের জীবন চরণও একে রকম। বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখক লিখেছেন এ আখ্যান। আসলে প্রতিটি মানুষের জীবনই একেকটি উপন্যাস। সৃষ্টিশীলÑ সম্ভাবনাময় লেখকের মতোই নানা রঙে, নানা ঢঙে রচনা করেছেন স্রোত আহমেদ তার উপন্যাসের কাহিনি। বাংলা উপন্যাসের যে বৈশিষ্ট্য তা অক্ষুণ্ন রেখেই স্রোত আহমেদ হাজির হয়েছেন পাঠকের দরবারে। মানুষ গল্প-কাহিনি শুনতে বা পড়তে ভালোবাসে। এই পাঠ-অভ্যাসের মধ্য দিয়ে সে মূলত নিজেকে আবিষ্কার করতে চায়। স্রোত আহমেদ সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তার লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান। সহজ-সরল ভাষায়, ছোটো ছোটো বাক্যে উপন্যাসের কাহিনিকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন। তার লেখার ভেতর মানব-মানবীর নিত্যদিনের একান্ত চাওয়াগুলো ফুটে উঠেছে। এতে রসিকতা আছে। আছে কৌতুকপ্রবণ উপস্থাপনের কৌশল। যাপিত জীবনের শত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিসহ সামগ্রিক চিত্রকে উপজীব্য করে রচনা করেছেন তার বহু কাক্সিক্ষত উপন্যাসÑ যার কেউ নেই। না থাকার মধ্য দিয়ে লেখক অনেক কথাই বলেছেন। অনেক ভাবনাই ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। যার কেউ নেইÑ সেই জনগোষ্ঠীরই প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আর নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত কিংবা খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিভূ এই উপন্যাস। তাদের বেড়ে ওঠা, পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীবনচারণের বয়ান নিপুণভাবে লেখক তুলে ধরেছেন। এ দেশে নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের বড় একটা আকাক্সক্ষাÑ তারা দেশের বাইরে গিয়ে কর্মজীবন পরিচালিত করবেন। তাতে চাহিদা মোতাবেক রুটি-রুজি এবং জীবনে সমৃদ্ধি অর্জন খুই সহজ। দীর্ঘকাল ধরে তারা এই মনোবাসনাই পোষণ করে আসছেন এবং কালক্রমে এ বিষয়টি সংস্কৃতিতে বা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। স্রোত আহমেদের উপন্যাসের বিবৃত্ত কাহিনি অনুযায়ী নায়ক ঠিক একই ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং পরবর্তীকালে সে প্রবাসী হলে জীবনে অনেক সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখেন। যখন যে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নেয় আর একটা জিনিস বাধা হয়ে দাঁড়ায়Ñ সেটা হলো তার প্রেম-ভালোবাসা। প্রিয়তম মানুষটিকে রেখে দেশান্তরী হওয়ার যে কষ্ট তা স্রোত আহমেদ খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তার উপনাসে। এ দেশে এ রকম অনেক যুবকদের ঘটনা আমরা প্রতিনিয়তই প্রত্যক্ষ করছি। নিয়ত সংগ্রামশীল এই মানুষগুলোর যে সংকট যেমনÑ নিত্যদিনের খাবার জোগানো, বাসা ভাড়া জোগানো, সাংসারিক প্রয়োজন মেটানোÑ ইত্যাদি তারা কোনোভাবেই যেনো পূরণ করতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য সামান্য এই চাওয়াটুকু পূরণ করতে তাদের নাভিশ^াস উঠে যায়। সারাটি জীবন তাদের সংগ্রাম করতে হয়। কোনো রকম রুটি-রুজি নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য। আমাদের আজকের লেখক নিজেও সেই কঠিন জীবনচারণের একজন সদস্য। পারস্পারিক স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা তাদের বেঁচে থাকতে অনুপ্রেরণা জোগায়। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী যেনো সবাই একই সুতোয় গাঁথা। জীবনে সমৃদ্ধি অর্জনের প্রবল আকাক্সক্ষা তাদের থাকলেও তারা এই ভালোবাসার বন্ধনে প্রকৃতিগতভাবেই আবদ্ধ। অনেক স্বপ্ন, সাধ আর আশা-আকাক্সক্ষা নিয়েই তারা দিনাতিপাত করে। এভাবেই তাদেও জীবন গঠিত। কখনো কখনো নস্টালজিয়ায় তাদের তাড়িত করে। গল্পের নায়ক তার বাল্যবন্ধুকে নিয়ে ঠিক এভাবেই স্মৃতিচারণ করেছেন। স্রোত আহমদের যার কেউ নেই উপন্যাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাকÑ ‘রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ফোন দিলাম সারোয়ারকে। আমার বাল্যবন্ধু সারোয়ার। যেটাকে কাঁচা ভাষায় বলেÑ নেংটাকালের বন্ধু। আসলেই তাই। ছোটোবেলায় দুজনে এক সাথে দাঁড়িয়ে নালার মধ্যে পেসাব করতাম। এক রকম প্রতিযোগিতা ছিল। কে কতোদূর পেসাব করতে পারি। আবার প্রতিযোগিতার ধরনও মাঝে মাঝে পাল্টে যেতো। সামনে পড়ে থাকা কাচের টুকরো অথবা ইটের খণ্ডকেও সবার আগে কে সই করে পেসাব করতে পারে। কখনো আমি জয়ী হতাম। কখনো সে। তবে জয়-পরাজয় নিয়ে কোনো প্রাইজ ছিল না। সব কিছুতে তো আর প্রাইজ নির্ধারণ করা যায় না। সে জিতলে মন খারাপ হতো না। অথবা আমি জিতলেও তার কিছু আসতো যেতো না। এটাই বোধ হয় কারণÑ এতোদূর পর্যন্ত বন্ধুত্বকে গড়িয়ে নিয়ে যাবার। তাই আজ অবধি সামান্য হাঁচি-কাশি হলেও দুজন দুজনকে জানিয়ে রাখি।’ এই সারোয়ারের জীবন এমনÑ সে ব্যবসা করতে করতে, টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে তার ভেতরের প্রেমিক মনটা একেবারেই মরে গেছে। অথচ তারও একদিন একটা প্রেমিক মন ছিলো। প্রেমিক ছিল এই সারোয়ার। শিউলির জলপাই খাওয়া দেখে সারোয়ারের মনে হলোÑ জলপাইয়ের বিচিতে এক গাল ফুলে থাকা শিউলি পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দরী।… পৃথিবীর সব মেয়েদেও শরীর এক রকম মাটি দিয়ে বানিয়েছেন। আর শিউলির শরীর স্বর্ণ দিয়ে বানিয়েছেন। যাতে সৃষ্টিকর্তা অতিরিক্ত কোনো অঙ্গ জুড়ে দিয়েছেন। মধুময় স্মৃতিচারণ। কী নস্টালজিক আবহ তৈরি করেছেন স্রোত আহমেদ তার উপন্যাসে। আবেদিন ও সারোয়ার উপন্যাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। একদিন আবেদিন সারোয়ারকে বললোÑ ‘আমি চাই তোর মতো প্রথিষ্ঠিত হতে আর তুই চাস আমার মতো লাভ গুরু।’Ñ এ রকম আরো অসংখ্য ঘটনার ঘনঘটায় উপন্যাসটি সমৃদ্ধ হয়েছে। পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এক ব্যথার পিরামিড তৈরি করেছেন কবি স্রোত আহমেদ। দূর প্রবাসে প্রতিটি মানুষের ভেতর কাজ করে এই স্মৃতিকাতরতা। স্বজনকে ছেড়ে দূর দেশে থাকা কতোটা কষ্টের, কতোটা বিরহের কেবল ভুক্তভোগীই জানে। এদেশ বরাবরই তা আগলে রেখেছে। উপন্যাসটার মূল কাহিনি বিবৃত হয়েছে প্রবাসজীবন বা প্রবাস সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে। বিদেশে আদম পাঠানোর ধান্দা করে অনেকই মেহনতী মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করে। কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকে না। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই জান এবং মাল দুটোই হারিয়ে ফেলেন। তবুও মানুষ স্বপ্ন দ্যাখে। আশায় বুক বাঁধে। জীবনের উন্নতির লক্ষ্যে বিদেশ পাড়ি জমায়। ধার-কর্জ কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা এ কাজটি করে থাকে। একটু সুখের আশায়, একটু শান্তির আশায়Ñ জগৎ সংসারের মায়া ত্যাগ করে প্রবাস জীবনে অভ্যস্ত হয়। লেখক এইসব বিষয়কেই মূলত তার যার কেউ নেই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। প্রবাসজীবনে পা রাখা যুবকটির স্বপ্ন-স্বাদ, চাওয়া-পাওয়াগুলো যেনো মোহময়ী কোনো বিষয়। স্বপ্নে দেখা রাজকন্যাকে যে নিজের করে নিতে তার কতো না কসরত দেখা যায়। ভালোবাসার মানুষটিকে তার কাছে পেতে কতো যে পাগলামী, কতো যে উচ্ছলতা, কতো যে নিমগ্নতাÑ লেখক তা সুচারুরূপে উপস্থাপন করেছেন তার উপন্যাসে। সুখময় একটা মুহূর্তের অবতারণা আমরা লক্ষ্য করিÑ ‘লাল রঙের একটা গোলাপ কিনে এনে টুনটুনিকে বললাম, শুভ জন্মদিন। সে যে কী খুশি! গোলাপ নাকি তার কাছে অনেক পছন্দের। দুনিয়াতে সব চাইতে বড় উপহার নাকি তার কাছে লাল গোলাপÑ আর আমি সেটা কী করে জানলাম, সেটা নিয়ে তার কৌতূহলের শেষ নেই। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো মেয়েটি। সে এক মুগ্ধ চোখ। সত্যি কেমন যেনো মেয়েটার ভেতরে সৌন্দর্য দেখতে পেলাম সেদিন। সুন্দর করে সেজেছিল সেদিন। অনেক মার্জিত। পরিচ্ছন্ন। এই মেয়ে সুন্দর। আগে কখনো এভাবে দেখিনি তাকে। খোলা চুল একপাশে। হালকা লিপস্টিক। অতিরিক্ত কিছুই ছিল না। একজন মানুষকে সুন্দর দেখাতে অনেক কিছুর প্রয়োজন হয় না। সে জিনিসটাই আজ প্রমাণ দিল টুনটুনি। নান্দনিক একটা আবহ এখানে লক্ষ করা যায়। সৌন্দর্যের কপাট খুলে দিয়েছেন লেখক। পৃথিবীতে যতো সৌন্দর্য আছে। নারী সৌন্দর্য তার অন্যতম। নারীর সেই মোহময়ী রূপটি যেনো ছুটে চলা নদীর মতো আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। সহজ-সরল কথামালায় এই সৌন্দর্যটুকু উপস্থাপন লেখকের দক্ষতারই পরিচয় দ্যায়। পছন্দের সেই মানুষটিকে অভিবাদন জানাতে লেখক একটি কবিতার অবতারণা করেছেন-যা উপন্যাসটিকে একটি নতুর মাত্রা দিয়েছে। ‘প্রথম স্পষ্ট’ নামক কারিগরটির প্রথম স্তবক উল্লেখযোগ্যÑ
‘ঝরিছে বরষা ব্যাকুল হইলো মন
ভুলিতে পারি না ক্ষণ
সদা মনে পড়ে
ত্রিচক্র রথে পিচঢালা পথে
রুখিয়া নিম্নে বড় ইমারতে
হস্ত দুখানা ধরে।’
রোমাঞ্চকর একটা আবহ লক্ষ করা যায় স্রোত আহমেদের এই কবিতার পঙ্ক্তিমালাগুলোতে। সেই আবহ আরও ঘনীভূত হয় যখন কাছের মানুষটি দূর প্রবাসে অবস্থান করে। তার অভাববোধ প্রিয় মানুষটাকে উন্মাতাল করে তোলে। বিরহ কাতর মন তার প্রতিক্ষায় চেয়ে থাকে সারাক্ষণ। এক রকম আনচান করে ওঠে মন। দুটি মানুষের বয়সের তফাৎ থাকলে ভালোবাসার কোনো ঘাটতি থাকে না সেখানে। লেখক এই বিষয়টিকে সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন তার উপন্যাসেÑ যার কেউ নেই। একটি ছোটো চারাগাছ যেভাবে কৃষক লালন-পালন ও আদর-যত্নে গড়ে তোলেন। প্রেমিক মানুষটি সেভাবেই তার প্রেমিকাকেই গড়ে তুলেছেন। চোখের সামনে লকলক করে বেড়ে ওঠা সেই বাচ্চা মেয়েটি এক সময় ভালোবাসার মহীরূহে, সামনের সমুদ্র বা রৌদ্রে পরিণত হয়। প্রকৃতিগতভাবেই তা হয়ে ওঠে অপরূপ অ্যাখান। ‘মুন্নিদের বাসা আমাদের বাসার বিপরীতে। আমার থেকে বারো বছরের ছেটো। বাবার বন্ধুর মেয়ে। জন্মেও পর যখন সে এক মাসের ছোটো শিশু তখন তাকে কোলে নিয়েছি। চোখের সামনেই বড় হয়েছে। তবে কবে যে তবে যে বড় হলো বুঝতেই পারিনি। আজ সে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। সামনা সামনি দেখা হলেই অপলক তাকিয়ে থাকে। কারণে-অকারণে বাসায় আসতে দেখেছি। কখনও দেখেছি আমাদের বাসায় কাটুন দেখতো। কখনও দৌড়ে এসে বলতো গল্প শুনবো। ভূতের গল্পই শুনতো বেশি। এই মেয়ে যে দিনে দিনে নারীতে রূপান্তরিত হয়েছে সেটা আমি ওভাবে লক্ষ করিনি। তবে তাকে আমার সেই ছোটো মুন্নিটাই মনে দেখলে।’ লেখক ঝরঝরে ভাষায় কথাগুলো বলেছেনÑ বলার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। নেই কোনো দুর্বোদ্ধতা। এভাবেই লেখক সরল ভাষায় পুরো উপন্যাসটি রচনা করেছেন। প্রবাস জীবনটা আসলে কেমন সে কথাই লেখক, স্রোত আহমেদ বারবার অনুধাবন করেছেন। বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সব ছেড়ে দূরপ্রবাসের জীবন কাটানো কতোটা কষ্টের, কতোটা দুঃখের তাও অনুধাবনের বিষয়। তবু তারা জীবন বাজি রেখে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। অর্জিত পারিশ্রমিক দিয়ে পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করছে। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলছে এইসব প্রবাসীরা। তাদের সারা জীবনের চেষ্টাÑ সাধনায় পৃথিবী হয়ে উঠছে সৌরভময়। পৃথিবীকে তারা নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে গঠন করছেন। মানব সভ্যতার সুখ-সমৃদ্ধিতেও তারা অবদান রাখছেন। এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা করেও তারা এক সময় একটু শান্তির আশায় মরিয়া হয়ে ওঠেন। বাহ্যিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও মানসিকভাবে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, মমতাময়ী কোনো নারীর আশায় একাকীত্বে থাকতে হয় সারাটি জীবন। অর্থবিত্ত অঢেল থাকার পরেও তারা যেনো কাঙাল হয়ে যায়। লেখক সেইসব ব্যথা-বেদনার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নিষ্পলক চোখে। তাকে তাড়িত করছে সেই উচ্চাভিলাসী মন। কী ছিল, কী আছেÑ এইসব প্রশ্ন তাকে আর জর্জরিত করে না। ‘কী যেনো নেই’ এই বিষয়টিই তাকে বারবার আঘাত করে। প্রবাসজীবনের এই অনুভূতিগুলো তাকে অন্য এক জীবনে নিয়ে যায়। লেখকের ভাষায়Ñ ‘কেউ কিছু বলছে না। গাড়ি চললো বিমান বন্দরের দিকে। টুনটুনিকে কাল বিদায় দিলাম। একটা সোয়েটার গিফ্ট করেছিল। ঠাণ্ডার দেশে কষ্ট হবে তাই দিয়ে দিয়েছি। নিয়ে যাচ্ছি সাথে সাথে করে। আজকে আমার চারপাশে এতো ভালোবাসা, এতো নারীর প্রেমÑ সবকিছু ছেড়ে দূরে ফেলে চলে যাচ্ছি দূর দেশে একটা প্রতিষ্ঠিত জীবনের আশায়Ñ পিছিয়ে পড়া জীবনে ঘোড়ার দৌড়ে প্রথম হবার প্রতিযোগিতায়। আজকে যারা কাছে আছে, তারাই হয়ে যাবে আমার দূর; আমি রবো একাকী হয়ে, সবাই থেকেও আমার কেউ থাকবে না। হয়তো অনেককে চিরতরে হারিয়ে ফেলবো। হয়তো সেই দূর দেশে এমন করে ভোরবেলা, এতোগুলো মানুষ আমাকে একনজর দেখার জন্য। আহা! কী আকুতি। একেবারে নিগুঢ় রসটা আসাদন করার প্রতিক্রিয়া যেনো। লেখক এভাবেই তার উপন্যাসটির কাহিনি বর্ণনা করে গেছেন। এক নিঃশ^াসে পড়ে ফেলার মতো উপন্যাস এটি। পাঠক মহলে উপন্যাসটি এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করবে আশা করা যায়। গতানুগতিক গল্প বা কাহিনির বাইরে এটি ভিন্নস্বাদের অবতাড়না করবে। ‘যার কেউ নেই’ উপন্যাসটি পাঠকের চাহিদা মেটাবেÑ এই আশা করা যায়। স্রোত আহমেদের উপমা, উৎপ্রেক্ষাগুলোও বেশ জটিল। মায়াময়। প্রেম ও রাজনীতির রসায়নে সমৃদ্ধ।
স্রোত আহমেদের ‘যার কেউ নেই’ আছে কবিতার মতো বেশ কিছু উপমা। যা উপন্যাসকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। এখানে আমরা কিছু উপমা তুলে ধরছি। ১. ওখানে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের মতো বর্ডারে বন্দুক নিয়ে কেউ দাঁড়েয়ে থাকে না। ২. কোথায় যেনো ছাড়া মুরগির মতো ঘুরে বেড়াতো।Ñ এই বাক্যটিতে উপমার সাথে উৎপ্রেক্ষাও কাজ করেছে। ‘কোথায় যেনো’ এখানে একটি উৎপ্রেক্ষা। ৩. পারভীনের আরেক বোন যেনো চিড়িয়াখানার জন্তু দেখার মতো তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো।
স্রোত আহমেদেরে ‘যার কেউ নেই’ উপন্যাসটি প্রকাশ পেয়েছে ‘বাসিয়া’ প্রকাশন থেকে। মনোরম প্রচ্ছদ সংবলিত চার ফর্মার এই বইটির মূল্য ধরা হয়েছে ২২০ টাকা। দেশে-বিদেশে বইটি ব্যাপক প্রচার-প্রসার পাবে। পাঠক মহল উপন্যাসটি সাদরে গ্রহণ করবেÑ এই প্রত্যাশা সবসময়…

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।