সুখবিলাসী : আলম সিদ্দিকীর ব্যথার পিরামিড

মৃধা আলাউদ্দিন
দেশ, জাতি ও সমাজের নিত্যদিনের ব্যথা-বেদনা, হাসি-আনন্দ-সুখবিলাস কথাসাহিত্যের ভেতর দিয়ে তুলে ধরা তথা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধমে জীবন চিত্রকে নতুন করে উপস্থাপন করতে পারাটাই উপন্যাসের বিরাট বৈশিষ্ট্য। বাংলাভাষায় কথাসাহিত্যের যাত্রা শুরু হয় আধুনিক যুগ থেকে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত থেকে বের হয় প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস। তারপর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, মানিক, তারাশংকর, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, কাজী এমদাদুল হক, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আকবর হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আসকার ইবনে শাইখ, রওশন ইজদানী, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, রশীদ হায়দার, আবু রুশদ, মিন্নাত আলী, আবু ইসাহাক, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আনোয়ার পাশা, মফিদুল হক, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, মঞ্জু সরকার, ইমদাদুল হক মিলন, কাসেম কিন আবুবকর, আবুল খায়ের মুসলেউদ্দিন, মইনুল আহসান সাবের, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ইসতিয়ার শামিম, নাসরিন জাহান, শহিদুল জহির প্রমুখ সাহিত্যিকের হাতে বাংলা সাহিত্য পেয়েছে নতুন, রঙিন মাত্রা। উপন্যাস তথা কথাসাহিত্যের এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছেন আলম সিদ্দিকী। তার প্রথম উপন্যাস ‘সুখবিলাসী’ প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১-এ। উপন্যাসটি জসিম উদ্দিন কর্তৃক ‘কথাপ্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির নজরকাড়া প্রচ্ছদ এঁকেছেন প্রচ্ছদশিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কথাসাহিত্যিক সুমন্ত আসলামকে। ১২৮ পৃষ্ঠার সুমুদ্রিত এ গ্রন্থটির দাম রাখা হয়েছে মাত্র ২০০ টাকা।
আলম সিদ্দিকী একজন সময়ের রুচিশীল ছড়াকার, কবি ও উপন্যাসিক। তার ব্যক্তি জীবন নানা মাত্রিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। অভিজ্ঞতায় প্রাজ্ঞ এই উপন্যাসিকের হাতে কথাসাহিত্য পেয়েছে আকাশ-আলো, নান্দনিক নদীসমৃদ্ধ পিরামিডের শক্ত হাতিয়ার জোছনাজলের নায়েগ্রার জলপ্রপাত। ফলে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা কিংবা আমেরিকা-বাংলাদেশ-আমেরিকার বিশাল ক্যানভাসে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সময় ও বোধের সচিত্র, সুন্দর কথামালা। ভাষার গভীরতায়, মমতার সহজিয়া সরলতায় ফুটে উঠেছে জীবনের এক রসায়নসম সমৃদ্ধ আখ্যান। যেখানে ব্যথার গল্পময়তা আছে। আছে ছন্দময় পথচলা। সেই সঙ্গে রয়েছে দুটি দেশের তুলনামূলক জীবনযাত্রার বাস্তব চিহ্ন- যা পাঠককে নিয়ে যায় চিন্তার গভীরে। আজারবাইজানের লেখক কুরবান সাঈদও তার ‘আলি ও নিনো’ উপন্যাসে মুসলমান ও খ্রিস্টান দুটি সমাজের প্রেম-ভালোবাসা, জীবন-সংঘাত ও মানুষের দ্বন্দ্বময় জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন। উপন্যাসটি ছিলো প্রথম বিশ^যুদ্ধ-পূর্ব ককেশাসের প্রেক্ষাপটে লেখা। যা আজও মানুষকে ভাবায়। হাসায়। কাঁদায়। কুরবান সাঈদ তার বইটির পরতে পরতে মানুষকে নিয়ে যায় চিন্তার গভীরে। এখানে কুরবান সাঈদ ও আলম সিদ্দিকী এক সরল রেখায়, এক বিন্দুতে ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীর পাহারে। পর্ব্বতে। তবে আলম সিদ্দিকীর উপন্যাসে আলি ও নিনো নেই আছে নাহিম এবং ফিয়োনা।
ফিয়োনার সাথে নাহিমের কিছু কথাবার্তা, মধুর আলাপন
অ্যার্টিনি বেশ ভালো মানুষ। অনেক খোলামেলা কথা বলেছেন।
সব বলো।
সব কথা ফোনে বলা যাবে না।
হাসলো ফিয়োনা। বললো, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুমি বিয়ে-শাদিও পরামর্শ নিতে গেছো অ্যার্টনির কাছে।
হুম, কিছুটি ও রকমই।
আরো কিছু কথা ফিয়োনা ও নাহিমের। তারা বলছে
অ্যার্টনি আরো একটি যুগান্তকারী অপশন দিয়েছেন, তোমাকে পওে বলবো। হা হা হা… ফিয়োনাও হাসলো। তারপর বললো, এখন কি তোমার বাসায় যাচ্ছো?
ন্ডম, আমার বাসায় যাবো না তো তোমার বাসায় যাবো?
আবারো হাসলো ফিয়োনা।
‘সুখবিলাসী’ উপন্যাসের নায়ক রাহিম উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমায়। নাহিম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। বাবার জমাজমি বিক্রি করে স্বপ্নের দেশে উড়াল দিয়েও নাহিমের সুখের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। ফাইনাল ইয়ারে উঠে জটিল রোগে আক্রান্ত হয় নাহিম। এ সময় চিকিৎসার অর্থ জোগাতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে চাকরি করতে যায় নাহিম। ফলে বহিষ্কারের নোটিস পায় নাহিম। এমনকি আমেরিকা থেকেও বেড়িয়ে যাওয়ার নোটিস দেয়া হয় তাকে। নাহিম তখন উকিলের কাছে পরামর্শের জন্য গেলে, উকিল তাকে অঅমেরিকার সিটিজেন এমন কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে বলে। অন্যদিকে নাহিমের ক্লাসমেট ফিয়োনাও তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে বহুবার। কিন্তু জটিল রোগে আক্রান্ত নাহিম সে প্রস্তাব বারবার এড়িয়ে গেছে।
কবি ও কথাশিল্পী আলম সিদ্দিকী এমন সূক্ষ্ম ও সুন্দরভাবে তার ‘সুখবিলাসী’ উপন্যাসের ঘটনা উপস্থাপন করেছেন যে, পাঠকমাত্রই চমকে যাবেন। নড়ে উঠবেন একটু নড়ার আগে। আলম সিদ্দিকীর উপন্যাসের পরতে পরতে রয়েছে নানাবিধ চমক। বর্ণনা ও ঘটনার ঘনঘটা তাল-লয় ও ছন্দের দোলা। আনন্দ-বেদনার এক অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন আলম সিদ্দিকী। তার সাবলীল উপস্থাপনায় রয়েছে জীবন দর্শনের নিবিড়, নতুন-সূক্ষ্মতম ছাপ। তিনি যখন বলেন, সুখের পেছনে ছুটতে ছুটতে অসুখ তৈরি করার নামই কি সুখ? তখন পাঠক সমাজও ভাবতে বাধ্য হন ‘কেনো এমন হয়?’ জীবনের রহস্যকে লেখক নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্ট করেছেন তার ‘সুখবিলাসী’ উপন্যাসে। গল্প তৈরিতে আলম সিদ্দিকী রেখেছেন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞতার ছাপ। ভাষা বর্ণনঅয় দেখিয়েছেন মুন্সীয়ানা অনন্য কারিশমা। বাংলাদেশ এবং আমেরিকার জীবনযাত্রার চিত্র এঁকেছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। মানচিত্র নয়; মানবচিত্রই সুন্দর-সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে আলম সিদ্দিকীর ‘সুখবিলাসী’ উপন্যাসে। ফলে মানুষের নীচতা, হীনতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে ভালোবাসা, উদারতা-আন্তরিকতা তথা মানবিক মূল্যবোধ।
একজন কবি ও ছড়াকারের হাতের স্বাদু গদ্যে রচিত ‘সুখবিলাসী’ উপন্যাসের ঘটনায় রয়েছে টান টান উত্তেজনা। দেশ, জাতি ও সমাজ সচেতনসমৃদ্ধ সুন্দর কথামালা। ১৭টি পর্বে সাজানো এ উপন্যাসে ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞানসহ সকল বিষয়কেই আলম সিদ্দিকী ছুঁয়ে গেছেন মার্জিতভাবে। গল্পের টানাপড়েনের সঙ্গে পাঠাক হৃদয়ও টালমাটাল হয় বারবার। যখন নাহিম-ফিয়োনার শুভ বিবাহ সুস্পন্ন হয় ঠিক তথনই যখন ডাক্তার সুসংবাদ জানেন যে, নাহিম পুরোপুরি সুস্থ। অর্থাৎ তার আর কোনো ভয়ের কারণ নেই। কিন্তু মানুষের মন যে কখন কী চায় তা কেউ বলতে পারে না। নাহিমের মন চায় সস্ত্রীক দেশে ফিরবেন। ফিয়োনাও দ্বিমত পোষণ করে না। হায় রে মন!
দেশে এসে নতুন করে জীবন শুরু করে নাহিম ফিয়োনা। কিন্তু মানুষরূপী পশু শফিকুলের প্রতিহিংসার শিকার হয় তারা। শফিকুলের শালিকাকে বিয়ে না করায় শফিকুল গুণ্ডা বাহিনী লেলিয়ে দেয় নাহিমের পেছনে। গুণ্ডারা খুন করে নাহিমের প্রিয়তম, সুন্দরী সুনয়না স্ত্রী ফিয়োনাকে। ক্ষোভে-দুঃখে নিঃস্ব জীবন নিয়ে ভেঙে পড়ে নাহিম। মনের মধ্যে জ¦লে ওঠে প্রতিশোধের দাউ দাউ করা তীব্র আগুন। … নাহিম বারবার ফোনের দিকে তাকায়। এই বুঝি ফিয়োনার কল এলো। নাহিমও চেষ্টা কওে কল দিতে। বারবার দুঃখিত বলে কেটে যায় কল। বুকে ব্যথা বাড়ে। মনে হয় ফিয়োনা কোথাও যায়নি। ঘরেই লুকিয়ে আছে।… দুপুরে ফিয়োনাকে খুঁজে পাওয়া গেলো। জীবিত নয়; মৃত। মর্গে। হাসপাতালের রিপোর্ট বলছে একাধিকবার ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। সোনাগাঁওয়ের কঙ্কালসার লাল ইটের পরিত্যক্ত ভূতুরে তিনতলা ভবনের ছাদে শ্লীলতাহানী করে ফেলে রেখে গেছে ধর্ষকরা। ভবনের বাইরে দরোজায় লেখা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, প্রবেশ নিষেধ। তাই কোনো মানুষ যায় না সেখানে। ধর্ষকরা সেই সুযোগ কাজে লাগায়। প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে। কেউ গুম হলেই পুলিশ তল্লাশি চালায় সেখানে। ওসি সাহেব নাহিমকে ডেকে নিয়ে এসব বললেন। আরো বললেন, এর বেশি কিছু তারা জানে না।
বুক ফেটে কান্না এলো নাহিমের। চিৎকার করে কাঁদতে থাকলো সে। দুচোখ বেয়ে নোনাজল নামতে থাকে তার…।

সে আবারো ছুটে যায় আমেরিকা। অবশেষে হত্যা কওে শফিকুলকে এবং চিৎকার কওে বলতে থাকে, আপনারা পুলিশে কল দিন। আমি খুন করেছি।
আলম সিদ্দিকীর ‘সুখবিলাসী’ উপন্যাসের আসমান ভেঙে পড়ার মতো হঠাৎ করেই সমাপ্তি ঘটে। তবে নায়ক নাহিমের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের চোখও ভিজে ওঠেÑ কান্না থামাতে পারে না পাঠককুল। তারাও নাহিমের মতো হাউমাউ করে ভেঙে পড়ে এক গভীর কান্নায়। লেখক আলম সিদ্দিকীর উপন্যাসের বর্ণনা বেশ চমৎকার ‘জেলখানার অন্ধকারে যখন বেশি খারাপ লাগে, তখন দুচো বন্ধ করে ফিয়োনার স্মৃতিতে ডুবে যাই। ঘোরের মধ্যে চলে যাই আমি। চলে যাই আমাদেও বেডরুমে। যেখানে ফিয়োনার সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো মধুর স্মৃতি। সবখানে লেগে আছে ফিয়োনার হাতের ছোঁয়া। আলমারিতে থরে থরে করে সাজিয়ে রাখা পুতুলগুলো। আমি তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকি ওগুলোর দিকে। তারপর একটা হাতে নেই। বুকের সাথে চেপে ধরি।দুগাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে পুতুলের ওপর। পানির সেই ফোঁটা এসে পড়ে আমার বুকেও…
এভাবেই চোখের জলে পরিসমাপ্তি ঘটে আলম সিদ্দিকীর উপন্যাস ‘সুখবিলাসী’র। শেষ হয় জীবনের জটিল সমীকরণ। শেষ হয় নাহিমের জীবন চলা। পাঠকের মনের অবস্থা তখন কেমন? পাঠকের মন কি তখন স্থির হতে পারে? এই সব প্রশ্নে উত্তর কখনো পাওয়া যায় না। পাওয়া যাবেও না হয়তো কোনো দিন এই পৃথিবীতে।
উপন্যাসিক আলম সিদ্দিকী তার প্রথম উপন্যাসেই পাঠকের মনকে জাগাতে পেরেছেন। পেরেছেন নাড়াতে রাঙাতে পেরেছেন এটাই আলম সিদ্দিকীর পরম সার্থকতা। সফলতা। আমরা উপন্যাসিক হিসেবে আলম সিদ্দিকীর উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। একই সাথে বইটি বহুল প্রচার, প্রসারও কামনা করছি। আলম সিদ্দিকী ‘সুখবিলাস’ উপন্যাসটি আপনার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবেÑ এ বলতে আমাদের আর কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।