সৈয়দ শামসুল হক : তাঁর প্রাণশক্তি ও চৈতন্য-জাগরণের কবিতা

গোলাম কিবরিয়া পিনু:
সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বেঁচে থাকার সময়ে আমাদের আগ্রহের মূলভূমিতে বিশেষভাবে ছিলেন, এখনো আছেন। বহুমাত্রিক ও সৃজনশীলতার এমন এক জগৎ তিনি নির্মাণ করেছেন, তা বিস্ময়কর-আমরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাঁর সেই জগতের দিকে তাকাই, আর অনুভব করি-লিখেছেন কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটক, কাব্যনাট্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ম্মৃতিকথা ও আত্মজৈবনিক রচনা, শিশু-কিশোর সাহিত্য, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কলাম। পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল নিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন, এসময়ে প্রায় আড়াইশত গ্রন্থের রচয়িতা হয়ে তিনি দেদীপ্যমান হয়ে আছেন।

তাঁকে আমরা অনেকে বেশ কাছ থেকে বিভিন্ন পরিধিতে দেখেছি, পর্যবেক্ষণ করেছি, তাঁর লেখার পাঠক হিসেবেও তাঁর কাছাকাছি থেকেছি–এই ধরনের সম্পর্কের অবস্থান নিয়ে বহু বিস্তৃত শব্দমালায় বৃহৎ এক মালা গাঁথা যায়, তা এই পরিসরে সম্ভব নয়, তাই–কিছু শব্দ নিয়ে আমার কিছু অনুভূতি ও বিবেচনা ব্যক্ত করছি মাত্র। আমার কাছে মনে হয়েছে-তাঁর জীবনের পুরো বয়সটুকু তারুণ্যদীপ্ত ছিল, শেষ বয়সে এসেও সেই উজ্জ্বলতা কমেনি খানিক, ছিলেন সবসময়ে কর্মচঞ্চল। মৃত্যুর আগে কর্কটব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পরও শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট নাটকের অনুবাদ, আটটি ছোটোগল্প, প্রায় দুইশত কবিতা ও কিছু গান রচনা করেছেন। কী প্রাণশক্তি! তা এক কৌতুহলোদ্দীপক অধ্যায়, যা থেকে আমরা অনুপ্রাণিত হতে পারি। আর একটি পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়–বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিংবা লেখক হিসেবে কিছু পুরস্কার অর্জিত হলে অনেকে লেখা থামিয়ে দেন বা সেভাবে লেখার গতিকে আর সম্মুখবর্তী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সৃজনশীল-স্পর্ধা দেখান না, সেই দিক থেকে সৈয়দ শামসুল হক ব্যতিক্রম, এক তুলনারহিত উদাহরণ। তাঁর বয়স যতই বেড়েছে, তাঁর লেখার গতি ততই বেড়েছে, ততই নিরীক্ষামূলক হয়ে উঠেছেন তিনি–বিভিন্ন লেখায় ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে। একটি উদাহরণ–মৃত্যুর আগের বিশ-পঁচিশ বছর সময়ে তাঁর জীবনের বেশিরভাগ কবিতা লেখা হয়েছে এবং কবিতার বইও বের হয়েছে বেশি!

তিনি দেখিয়েছেন-প্রতিভা আকাশ থেকে পড়ে না, এজন্য লক্ষ্যমুখী হয়ে সবসময়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রতিভার পরিচর্যা করতে হয় ধারাবাহিকভাবে–একনিষ্ঠ হয়ে শ্রমের অবিকল্প পথে, এক্ষেত্রে অবহেলা চলে না, যে যত নিবেদিত হয়ে কাজ করবেন, তাঁর ফসলের বৈচিত্র্য ও পরিধি তত উজ্জ্বল হবে। সাহিত্য-শিল্পের জীবনকে তিনি তাঁর কোনো নির্দিষ্ট পেশা ও অন্যান্য কাজে বেশি ব্যয় হতে দেননি, তা বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে একধরনের ভারসাম্য বজায় রেখে লেখকজীবনকে করেছেন অলোকসামান্য।

সৈয়দ শামসুল হক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন না, ছিলেন না সাহিত্যের কোনো নামকরা শিক্ষক কিন্তু তাঁর সাহিত্য বিষয়ক লেখা থেকে আমরা পাঠ নিয়ে নিজেদের জ্ঞানস্পৃহা মিটিয়েছি। ‘মার্জিনে মন্তব্য, গল্পের কলকব্জা’র মতো বই থেকে আমরা শিখেছি অনেককিছু। ‘সংবাদ সাময়িকী’তে তিনি ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন লিখতেন ‘হৃৎকলমের টানে’ নামের সাহিত্য-শিল্প বিষয়ক কলাম, যে-কলাম পড়ার জন্য আমরা কী আগ্রহে নিয়ে প্রতি সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম, কত রকমের বিষয় টেনে-তুলে এনে আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত করেছেন তিনি, আমাদের বিবেচনার সামর্থ্য এইসব কলামের অভিঘাতে বাড়িয়েছেন, এসব লেখার পাঠক মাত্রই তা জানেন। তাঁর নাটক আমরা দেখেছি, তাঁর উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ পড়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস পড়ার প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠস্পৃহা মিটিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অন্যান্য লেখকের উপন্যাস পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছি। কত রকমের লেখা কতভাবে যে আমাদের অনুরণিত করেছে!

লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন, বিশেষত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের সাথে যুক্ত ছিলেন, এক সময়ে ছিলেন এই সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বেও, আমিও একসময়ে ছিলাম এই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য দায়িত্বে, এ-কারণে তাঁর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ ও সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল-কাছ থেকে বিভিন্ন অভিঘাতে তাঁকে দেখেছি। এই তো নিকট অতীতে এক-এগারোর সময়, সামরিক সরকারের আমলে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল বেশ নিয়ন্ত্রিত, সে-সময়ের প্রথম দিকেই শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার কক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলাম অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে,অনেকে ভয়ে সেদিন সে-সভায় আসেননি–ডাকার পরও,কিন্তু তিনি আমাকে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করার জন্য সাহস জুগিয়েছিলেন এবং তিনি সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ও জাতীয় কবিতা পরিষদের বিভিন্ন অভ্যন্তরিণ সংকটে তিনি আমাদের একজন অভিভাবকের মত পাশে থেকে পথ দেখিয়েছেন। তাঁর বাসায় কতদিন গিয়েছি-সাংগঠনিক ও অন্যান্য প্রয়োজনে।

অন্যদের সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল জানিনে, অন্য পরিধি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আমাকে যখনই দেখেছেন তিনি–তখনই আন্তরিকভাবে কুশল জিজ্ঞেস করেছেন আমার। আমাদের শ্রদ্ধেয় আবুল হাসনাত, যখন ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সাময়িকী পরিচালনা করতেন, তখন তা ছিল বিশিষ্ট, তাতে আমার লেখাও ছাপা হতো নিয়মিত, আমরা গৌরববোধ করতাম এতে লেখা ছাপা হওয়াতে, সেই সময়ে সৈয়দ শামসুল হক এতে নিয়মিত লিখতেন, কখনো কখনো এই সাময়িকীতে আমার ছাপা কবিতার লাইন ফোনে হক ভাই তাঁর ভরাট গলায় আবৃত্তির মত করে শুনিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে এতে আমি বেশ প্রেষণা পেয়েছি, তা কি ভুলতে পারি! আরও অনেক উদাহরণ আছে–তিনি তাঁর নিজের আগ্রহে আমার কবিতার বই ‘আমরা জোংরাখোটা’র আলোচনা করেছেন তাঁর উপস্থাপিত ‘চ্যালেল আই’-এর অনুষ্ঠানে বিস্তৃতভাবে। ফোনে তাঁকে ম্যাসেস দিলে তাঁর উত্তর দিতেন, ফোন না ধরতে পারলে, ফোন ব্যাক করতেন। এসব উদাহরণ দিলাম এই জন্য যে-একজন ব্যস্ত, গুরুত্বপূর্ণ ও সিনিয়র লেখক হয়েও এক অনুজের সাথে কি ভদ্রতায়, কি আচরণে একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে ছিলেন কত অগ্রসর।

সৈয়দ শামসুল হকের অন্যান্য লেখার পাঠক হওয়ার পরও বিশেষত কবিতার পাঠক হিসেব হিসেবে আমিও একজন তাঁর কবিতার সুলুকসন্ধানী ও কৌতুহলী পাঠক। তাঁর প্রায় সব কবিতা পড়েছি, যখন তাঁর কবিতা কোনো সাময়িকী বা পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তা মনোযোগের সাথে পড়েছি। তাঁর শেষের দিকে লেখা কবিতাগুলো তিনি খুব সচেতনভাবে গণআন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধ-বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে তাঁর গভীর ধ্যানমগ্নতা-অভিজ্ঞান-সংবেদ-ধীশক্তি-কল্পনা ও ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে নিমার্ণ করেছেন। এসব কবিতা তাঁর কাব্যজগতের এতটা জায়গা নিয়ে আছে, তা একত্রে পড়লে বিস্ময়াভিভূত হই! তাঁর আত্মমুখী প্রেমচেতনার কবিতার পাশাপাশি এইসব কবিতার জগৎ বহুবর্ণিল ও বিচিত্রমুখী বোধভাষ্যি নিয়ে চৈতন্য-জাগরণের কবিতা হয়ে উঠেছে।
সৈয়দ শামসুল হক উচ্চারণ করেন এমনই পংক্তি, যে পংক্তিতে দেশের স্বাধীনতার কথা উচ্চকিত হয় :
‘কেউ যখন তাদের স্বাধীনতার কথা বলছে
তারা আমাদেরই কথা বলছে;
তাদের উত্তোলিত পতাকার ভেতরে আন্দোলিত হচ্ছে
আমাদেরই পতাকা;’
(বন্ধুদের জন্য কবিতা)।

তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ কতভাবে যে এসেছে, উদাহরণ:
‘দশ লক্ষ ধর্ষিতার আর্তনাদে যখন নষ্টমান আমার শ্রুতি,
তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তে যখন প্লবমান আমার স্মৃতি,
তিন কোটি মানুষের গৃহত্যাগে যখন বিলীয়মান আমার সভ্যতা,
বলীবর্দের দ্বিখণ্ডিত খুরে যখন কম্পমান আমার স্বপ্ন,
যখন এই বর্তমান, এই শ্রুতি, এই স্মৃতি, এই সভ্যতা, এই স্বপ্ন
এত দীর্ঘকাল আমি একা আর বহন করতে পারছি না’
( ব্রহ্মপুত্রের প্রতি)।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক অনেক কবিতা লিখেছেন, একটি কবিতার অংশ, যেখানে কবি বঙ্গবন্ধুকে এক ভিন্ন ব্যঞ্জনায় মহিমাময় করেছেন :
‘এই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি–
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।’
(আমার পরিচয়)।

কবি তাঁর বাংলাদেশকে এমন এক অস্তিত্ব নিয়ে ইন্দ্রিয়গোচর করে তোলেন, যা থেকে পাঠকমাত্রই সংবেদনা নিয়ে এক স্বদেশমুখী জাগতিকতা খুঁজে পান, তেমন একটি কবিতার অংশবিশেষ :
‘এই নদী ও সমতলভূমি যেমন আমার,
তেমনি এই পাহাড় ও উপত্যকা আমার;
এই পাহাড় ও উপত্যকা যেমন তোমার,
তেমনি এই নদী ও সমতলও তোমার।
জননীর স্তনমধ্যবর্তী জমিতে আজ আবার প্রবাহিত দুধ
এবং দিবস আজ দুধের ঘ্রাণে হয়ে উঠেছে মাতাল।
এসো তবে আজ এই সমতলে
এবং এসো তবে এই উপত্যকায়, এই দুধ
আমরা দু’হাতের পেয়ালায় করি পান,
আর সমস্বরে গাই একটি গান :
আমরা সকলেই তো এক সবুজ রাষ্ট্রের সন্তান।’
(পাহাড় ও সমতলের গান)।

তিনি অজস্রপ্রসু কবি ছিলেন, এত কবিতা মনে হয় শামসুর রাহমানের পর তিনিই লিখেছেন। লিখেছেন চৈতন্যের বহু স্তর ও বহু বোধের সম্মিলনে। কবি সৈয়দ শামসুল হক এক গভীর প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষ ছিলেন, এই আত্মশক্তির স্পর্ধায় তাঁর সৃজনশীলতা তিনি ধারাবাহিকভাবে বিচিত্র পথে প্রবহমান রেখেছেন, পরিব্যাপ্ত করেছেন : তাঁরই আলোকবিচ্ছুরণ থেকে আমরাও সংবেদী হয়ে উঠতে পারি।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।