স্মৃতির পাতায় বৃষ্টি

কবি উত্তম দাশের সাথে জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা সহ কলকাতা, ঢাকা এবং কক্সবাজারের লেখক বৃন্দ। ছবি : রিশাদ হুদা

আলম তৌহিদ

২০১৪ সালে আমি শারজাতে ছিলাম। ১২ জুন প্রবাসে বসেই জানতে পারলাম কবি-গবেষক-অধ্যাপক উত্তম দাশের মহাপ্রয়াণের কথা। খবরটা শুনেই আমার বিমর্ষ চেতনায় ঝলসে উঠল ২০১০ সালের একটি স্মৃতি। ভাবলাম উত্তম দাশকে নিয়ে কিছু একটা লেখা উচিৎ। যেই ভাবনা সেই কাজ। বসে গেলাম লিখতে। কিন্তু এক পৃষ্টা লিখে আর অগ্রসর হলো না লেখাটি। ফেলে রাখলাম। অনেক লেখার ভিড়ে চাপা পড়ে রইল। আমিও উদাসীন লেখকের মতো বিস্মৃত হয়ে রইলাম। আজ ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ সাল। উত্তম দাশের অসম্পূর্ণ লেখাটি উঠে এলো হাতে। কিন্তু মনপুত হলো না। অতএব নতুন করে আবার যাত্রা।

কবি উত্তম দাশের সাথে লেখক আলম তৌহিদ

কবি উত্তম দাশের সাথে আমার পরিচয় হুদা ভাইয়ের (জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা) কল্যাণে। ২০১০ সালে কবি উত্তম দাশ সস্ত্রীক (ড.মালবিকা দাশ) হুদা ভাইয়ের সঙ্গে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন। তখন উত্তম দাশ সত্তর বছরে পদার্পণ করেন। আমরা দরিয়ানগর কবিতা বাংলার পক্ষ থেকে কবিকে কক্সবাজার পৌরসভা মিলনায়তনে ৯ জানুয়ারি সংবর্ধনা দিই এবং উদযাপন করি সত্তরতম জন্মবার্ষিকী। আমাকে করা হয় সংবর্ধনা কমিটির আহবায়ক। এই সূত্রে উত্তম দাশের সাথে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং সেইসময় আমরা সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনাও করি। অত্যন্ত অমায়িক, সুদর্শন এবং আলাপপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। স্বভাবে নিভৃতচারীও। প্রজ্ঞাবান মাত্রেই নিভৃতের ভাবুক-উত্তম দাশকে আমার তাই মনে হতো।

উত্তম দাশের জন্ম নোয়াখালী জেলার চর আলেকজান্ডার গ্রামে। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের সময় তাঁদের পরিবার পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসিত হয়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমানো আরো অনেক খ্যাতিমানদের ভিড়ে উত্তম দাশ ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল। জন্মভূমি ত্যাগের স্মৃতি ও ভালোবাসা তাঁর কবিতায় চিত্রিত হয়েছে এভাবে-
“মুহূর্তে এসেছি ফেলে
জানালার চাপা দৃষ্টি ব্যাকুল বাগান
ভ্যান গগের আঁকা স্বদেশী মাঠের হাওয়া
রাস্তার ধারের সেই খেঁজুর গাছ গাড়োয়ানরা
ইজারা নিয়েছিল বলে যে আট বছর শৈশবের
মাঠে দাঁড়িয়েছিল-মনে পড়ে আমাকে তোমার
উনিশ শ সাতচল্লিশের বাংলাদেশ
আমার সুতো-ভর্তি লাটাই ফেলে
আমি জারির দোনার কুমিরের ভয় ফেলে
অচেনার চেয়ে সুদূর অন্য দেশে চলে গিয়েছিলাম
-মনে পড়ে”
(মনে পড়ে/জ্বালামুখে কবিতার)

কবি মাত্রেই রোমান্টিক। কিন্তু এই রোমান্টিকতা কেবল নারী ঘটিত ব্যাপার নয়। কবি প্রেমিক, এই ধ্রুবকে ধারণ করে কবির প্রেম ছড়িয়ে যায় বস্তু থেকে বস্তুতে, এমনকি অপার্থিব অসীম কল্পলোকেও। তাই একজন কবি হয়ে উঠেন মহাপ্রেমিক। উত্তম দাশও প্রেম বিবর্জিত নন; বরং তাঁকে কবি হিসেবে রোমান্টিক এই অভিধায় ভূষিত করা যায়। তবে রোমান্টিকতার উম্মুক্ত আবেগে ভেসে বেড়ানো তাঁর স্বভাব নয়। রোমান্টিকতাকে তিনি অন্তপুরেই লুকিয়ে রাখেন, যেমন করে লুকিয়ে থাকে ঝিনুকের খোলসে চকচকে মুক্তো। সুতরাং খোলস মুক্ত করলেই চেনা যাবে উত্তম দাশ কতোটা রোমান্টিক। তাঁর একটি কবিতার অংশবিশেষের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক-

“এখন রাত একটা, বাইরে গোয়েন্দা গল্পের মতো
বৃষ্টি হচ্ছে, নিশ্চয় খুব পিছলপথ ঘাট, রাধে
পশ্চিমবঙ্গের এই পুলিশি ব্যবস্থায় তুমি আর
অভিসারে বেরিও না, তোমার শ্রীমান ভিজুক।
…. …. …. …. ….
রাধা, অনুবাদ কবিতার মতো তুমি শরীর থেকে
বিদেশি অলংকার খুলে ফেল, তুমিও ভিজতে থাক
রাত একটার বৃষ্টিতে সদ্য মাথা ছাড়িয়েছে
এমন গাছের অরণ্যে, তোমার শ্রীমানের সঙ্গে।”
(রাত একটার বৃষ্টি)

ড.উত্তম দাশ কেবল কবি নন, তাঁর অন্য পরিচয়ও আছে। প্রাবন্ধিক-গবেষক-সম্পাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি আছে। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন খিদিরপুর কলেজে। কবিতার ছন্দ নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। কাজটি অবশ্যই উঁচুদরের। তাঁর ‘কবির ছন্দ : কবিতার ছন্দ,’ বইটি সেই দৃষ্টান্ত বহণ করছে। এক্ষেত্রে ‘বাংলা ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি’ বইটিও স্মরণযোগ্য। রবীন্দ্র সঙ্গীতের ছন্দ নিয়েও তাঁর অসাধারণ কাজ আছে। ‘ছন্দোবন্ধনে অধরামাধুরী’ গ্রন্থে জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ছন্দ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লিখেন। তাঁর প্রবন্ধে বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ এবং সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ আছে। সম্পাদনা করেছেন বহ্নিশিখা ও মহাদিগন্ত নামে দুটি পত্রিকা। নাটক নিয়েও কাজ করেন। বাংলা কাব্যনাট্য (১৯৮৯) নামে নাটকের উপর একটি চমৎকার বই লিখেন। তাঁর বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো-বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৬৫), যখন গোধূলি (১৯৬৬), জ্বালামুখে কবিতার (১৯৮০), কবিতার সেতুবন্ধ (১৯৮০), এ জন্মের প্রত্যাহার চাই (১৯৮৩), কাব্যনাট্য ও কবিতা (১৯৯৯), প্রকীর্ণ কবিতা (২০০৭), ঠাকুরপুকুর থেকে (২০১২)। এছাড়াও তিনি আরো বহু গ্রন্থের রচয়িতা।

উত্তম দাশকে নিয়ে লিখতে গেলে অনেক কথাই লিখতে হয়। কেননা তাঁর রয়েছে বিশাল এক কর্মময় জীবন। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য তা নয়। আমি কেবল স্মৃতির পাতায় জমে থাকা ধুলোটুকু সরাতে চেয়েছি। তাই ফিরে যাচ্ছি কবিকে দেয়া সংবর্ধনার সেই দিনটিতে। অনুষ্ঠান আয়োজনে সেসময় কক্সবাজারের কবি-সাহিত্যিকদের কাছ থেকে যে আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছিলাম তা অবশ্যই স্মরণযোগ্য। দীর্ঘ সময় প্রবাহে আজ অনেকের নাম বিস্মৃত হয়ে আছি। তবু যাদের নাম এ মূহুর্তে মনে পড়ছে তারা হলেন-নাট্যজন কামরুল হাসান, কবি সিরাজুল হক সিরাজ, কবি মানিক বৈরাগী, কবি মাসউদ শাফি, গবেষক কালাম আজাদ, কবি নিলয় রফিক, কবি নোমান মাহমুদ। কক্সবাজারের অনেক কবি-সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ মূহুর্তে মনে পড়ছে সাংবাদিক গবেষক মুহম্মদ নূরুল ইসলাম, কবি প্রাবন্ধিক সুলতান আহমদ, কবি রুহুল কাদের বাবুল, হাসিনা চৌধুরী লিলি, কবি মঞ্জুরুল ইসলাম,রিশাদ হুদা, কবি রফিক মাহমুদ, কবি নিধু ঋষির নাম। সুদূর সাতকানিয়া কলেজ থেকে এসে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন কবি রুহুল কাদের।

কবি উত্তম দাশের সাথে জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদাসহ কলকাতা, ঢাকা এবং কক্সবাজারের কবি লেখক বৃন্দ

স্মৃতি রোমন্থন আমাদের নস্টালজিক করে। কিন্তু এই যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে রোমন্থনের অবকাশ কোথায়। তাই স্মৃতির উপর একসময় জমে উঠে প্রলম্বিত কালের ধুলো। স্মৃতি ঝাপসা হয়, কতক মুছেও যায়। কবি উত্তম দাশের তিরোধানের বহু বছর পর আমার স্মৃতির পাতায় এই এক পশলা বারিপাত না হলে, হয়তো এটুকু স্মৃতিও কালের ধুলোয় হারিয়ে যেত।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।