আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে শাহিদ আনোয়ারের লাল মাফলার!

মোশতাক আহমদ
অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন দৈনিক আজাদীর সাহিত্য সম্পাদক। একদিন অরুণদার বাসায় গেছি। পান চিবোনো শেষ হলে আমার কবিতা দুটো জমা রাখবেন, অপেক্ষায় আছি। দেখি কবি শাহিদ আনোয়ারও আছেন, কিংবা অরুনদার বাসা থেকে বেরিয়েই তার সাথে দেখা হল।

যাহোক ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে শাহিদ আনোয়ার বললেন তাঁর কবিতার বইয়ের নাম ঠিক করেছেন ‘ আকাশের দিকে ওড়ে লাল মাফলার’। তখন দেশে সেনাশাসন, পৃথিবীতে তখনও খোলা হাওয়া আসেনি, লাল রঙের একটা দ্যোতনা বিরাজ করত। দুজনেরই গন্তব্য সবুজ হোটেল। ওখান থেকে রিকশা ছাড়া গতি নাই। কিন্তু কবি রিকশায় যাবেন না। হেঁটে হেঁটে ( সন্ধ্যার আকাশ দেখতে দেখতে?) যাবেন। তাঁকে বিদায় দিয়ে একাই রিকশায় চাপলাম। কিছুদূর যেতেই পাহাড়ি উজানী রাস্তা ফুঁড়ে ছোট্ট একটা দা হাতে এক তরুণ আগন্তুক আমার রিকশা রোধ করে দাঁড়িয়ে ঘড়িটা খুলে নিতে নিতে মানিব্যাগটা চাইলেন। আমি দুপকেট থেকে খুচরো খাচরা টাকা বের করতে করতে বললাম, আমিতো মানিব্যাগ ইউজ করি না! ( সত্যিই তাই)। যাহোক তুই সম্বোধন করে ব্যাক করে যেতে বলল রিকশা নিয়ে। আমি খুব আহত হইনি কেননা সেদিন বিকেলে পাওয়া পুরো মাসের খরচটা প্যান্টের ব্যাক পকেটে অক্ষত ছিল।

সবুজে পৌছে শাহিদ আনোয়ার এবং অন্যান্য আড্ডাবাজদেরকে পেলাম। ঘটনার পর্যালোচনা দ্রুতই শেষ হল, কেননা সে জমানায় এরকম ‘ঝাপটা’ খুবই সাধারণ ব্যাপার এবং অনুল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। শাহিদ আনোয়ার সেদিন আমার কবিতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটা কথাই বললেন – “কবিতায় exploration আছে”। মানে ভাল বুঝিনি কিন্তু বড় ভাল লেগেছিল এই উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য।

কিন্তু ওই লাল মাফলারের কথা ভুলিনি, যদিও ওই শিরোনামে কবির কোনো বই প্রকাশের কথা আমার জানা নেই! শীতের দিনে মাফলার পড়লেই কবির অদেখা সেই লাল মাফলার মনে পড়ে যায়। গত বছর কবির সহধর্মিণীর ফেসবুকে কবির শ্রেষ্ঠ কবিতার ‘ দেখনহাসি’ ধরনের প্রচ্ছদ প্রকাশিত হতে দেখেই এই গল্পটা লিখেছিলাম।
২.
শাহিদ আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতার বইতে লাল মাফলার সংক্রান্ত কবিতাটি আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল; শোয়েব নাঈম ভাই মনে করিয়ে দিলেন। শাহিদ আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতার বই হাতে নিয়ে জেগে উঠল পাঠ্যস্মৃতি। জানি ক্ষুধার্তের মতো পড়া যায় রহস্য উপন্যাস, কিন্তু এই কবিতার বইটিও আমি ক্ষুধার্তের মতোই পড়ে ফেললাম। ক্ষুধা অবশ্য মেটেনি। প্রসংগত উল্লেখ্য, কবিদের স্বতন্ত্র কবিতার বই পড়ে যে তৃপ্তি পাই, শ্রেষ্ঠ কবিতা কিংবা নির্বাচিত কবিতা পড়ে আর সে মাত্রার তৃপ্তি আমি পাই না, কারণ সম্ভবতঃ পাঠ্যস্মৃতির মানদন্ডে কবিদের কাছে আমার উচ্চ আকাংখার পারদ।

শাহিদ আনোয়ারের প্রথম একগুচ্ছ কবিতা পড়ার স্মৃতি মনে করতে পারি ১৯৮৮ এ চট্টগ্রামের প্রতিবাদী কবিতা উৎসবে সমকালীন কবিদের একটা কবিতা সংকলন থেকে। নিশুতিরাতে স্থূল ভারি একটা পতনের শব্দ শুনে কোন অভাগীর মস্তক থেকে রক্ত গড়ালো ভাবতে ভাবতে পাশ ফেরা কবির অভিজ্ঞতাটি বাংলাদেশের বিখ্যাত একটি ছোট গল্পের দৃশ্যের সাথে যেমন মিলে যায়, কবির আর একটি কবিতার প্রতিবেশিনীর জন্য শোকগাথা তেমনি পঁচিশ বছর আমার করোটির ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল সেই কবিতারই প্রতিকবিতা নিজের জন্য একটি এলিজি! আলো আঁধারীর জ্যোৎস্নায় অনুচ্চ স্বরে চাঁদ বা মেঘের সাথে কবির পরামর্শ করে নেয়ার বুদ্ধিটাও বেশ মনে পড়ে, বেশ লাগে! কবি লিখেছেন মনোটোনাস গর্ভে কুঁকড়ে থাকা থেকে মুক্তকারী ধাত্রীর জন্য আকাংখার কথা, শাদা পোশাকের নার্সের হাতে শিরায় অমৃত মেশানোর রূপকথা। শাহিদ আনোয়ারের এই ধাত্রী আর সেবিকা বাংলা কবিতার কালোত্তীর্ণ দুটি চরিত্র । এক মুখে আল্লাহর বাণী সরাসরি কবিতায় নিয়ে এসে আল্লাহর রঙে রঞ্জিত সুন্দর সংঘের কথা বলছেন, অন্য মুখে গণিকার মর্মবেদনার কথাও বলছেন। অনুসংগ হিসেবে শুঁড়িখানা এই কবির কাছে গালীবের মতোই আরাধ্য। শুঁড়িখানার ছদ্মাবরনে জীবন ও জগতকে উন্মোচিত করেছেন এক গ্রন্থে।

সন্দেহ জাগে, তিনি কি এ কালের মির্জা গালীব কিংবা বিশ শতকের রূমি?

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।