প্রধানমন্ত্রীর কাছে কবির আহমদের সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রীর দাবি শহিদ স্বামীর স্বীকৃতি

শহীদ কবির আহমেদের স্ত্রী আলমাছ খাতুনের সাথে লেখক কালাম আজাদ। ছবি : তাহফিজুল আনাম

কালাম আজাদ

আমার দিন এখন শেষ। কোনো সুযোগ সুবিধা পাবো এই আশাও ছেড়ে দিয়েছি অনেক আগেই। দেশ স্বাধীনের পর শেখ সাহেব কক্সবাজারে এসে আমার সাথে দেখা করে একটি সহানুভূতিপত্র ও দুই হাজার টাকার একটি চেক দিয়েছিলেন। এবং আমাদের সাথে প্রায় ঘণ্টাখানেক কথা বলে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেখাশুনার কথাও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ সাহেব মারা যাওয়ার পর আমাদেরকে কেউ খবর রাখেননি। শেখ সাহেবের মেয়ে হিসেবে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবি- শহিদ স্বামীর স্বীকৃতি, শহিদের স্ত্রী হিসেবে একটি খাস জমি আমার বন্দোবস্তকরণ এবং জীবনের শেষ ইচ্ছা হজ্জ করা-এ তিনটি দাবি পুরণ করতে পারলেই উনার কাছে আর কোনো দাবি থাকবে না। আমার স্বামী দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন তার চেয়ে কী স্বান্তনা হতে পারে।

একজন শহিদের স্ত্রী হিসেবে ক্ষোভ ও স্বান্তনামূলক এই তিনটি দাবি পুরণের দাবি করছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এক বীর শহিদ ডাক্তার কবির আহমদের সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রী আলমাছ খাতুন।
কবির আহমদ। পেশায় কবিরাজী চিৎিসক। বাজারে বাজারে ক্যাম্পিং করে লতা পাতা তথা কবিরাজী ওষুধ বিক্রি করে সংসার চালানোই তার কাজ। সংসার চালানোর পাশাপাশি মানুষের সেবা করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে কাজ করতে গিয়ে দেশে যখন যুদ্ধ শুরু হলো ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি মানুষের মুক্তির লড়াকু সংগঠনের মার্কা নৌকার লিফলেটও বিতরণ করা শুরু করেন এবং এভাবে করতে করতে একদিন সত্যি সত্যি দেশ ও মাতৃকার টানে প্রাণ দিলেন। মানুষের সেবা করতে করতে দেশের জন্যই প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন তিনি সত্যি দেশপ্রেমিক। ১৯৭১ সালে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন নিরীহ এই কবিরাজ। দীর্ঘ ৪৬ বছরে শহীদ কবির আহম্মদের স্ত্রী ও সন্তানেরা পায়নি শহিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতি। ভাঙা কুঁড়েঘরে অর্ধাহারে অনাহারে বিধবা আলমাছ খাতুনের দিন কাটছে। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া সহানুভুতির চিঠি আর ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ২ হাজার টাকা ছাড়া এখনো পর্যন্ত আর কোন সাহায্যই পাননি শহীদের স্ত্রী আলমাছ খাতুন। শহিদের স্ত্রী আলমাছ খাতুন স্বামীকে এতই ভালোবাসতেন আর বিবাহও করেননি।

কবির আহমদ সাতকানিয়ার পদুয়া নিবাসী আলী বকসুর ঔরসে ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করলেও পিতা আলী বকসু মারা যাওয়ার পর দেশভাগের পরে কবিরাজী পেশায় নিয়োজিত হয়ে জীবনের গ্লানি টানতে কক্সবাজারে স্থিত হন। স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সবার মনও কেড়ে নিতে পারতেন। ঠিক তেমনি নিতে পেরেছিলেন কক্সবাজার শহরের নতুন বাহারছাড়ার প্রবীণ মুরব্বী খলিলুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৩) অন্তরও। কবির আহমদের গুণ দেখে তারই দ্বিতীয় মেয়ে আলমাছ খাতুনের বিবাহ দেন ১৯৬১সালের শুরুতে। সরাসরি কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তথাপি তিনি স্বাধীনচেতা একজন বাঙালি হিসেবে গর্ব করতেন এবং সেভাবে সন্তানদেরকে শিক্ষা দিতেন। পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে সন্তানদেরকে তেমন বেশি লেখাপড়া করতে পারেনি বলে দু:খ ছিল তার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাপিয়ে পড়ে। চালায় নগ্ন হামলা। এ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। ৫ মে এর আগ পর্যন্ত কক্সবাজারের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কক্সবাজার। কিন্তু ১১ এপ্রিল কালুরঘাট পতনের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে আসার রাস্তা ফাঁকা করে নেয়। তারপরেও কক্সবাজার মহকুমায় আসতে সময় নেয় প্রায় একমাস। ২৭ এপ্রিল পাকবাহিনীর সদস্যরা কক্সবাজারের চকরিয়া দখলে নেয়। এরপর ৫ মে কক্সবাজার পতনের পর পাক বাহিনী একে পর এক হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাক বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর, মুজাহিদ, শান্তিকমিটি এবং আলশামসদের রামরাজত্ব চলে এ কক্সবাজারে। মে থেকে অক্টোবর অনেক পানি ঘোলা হয়েছে কিন্তু তাদের নির্যাতন বন্ধ হয় নি। পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের এসব অত্যাচার দেখে স্বাধীনতাপ্রিয় ডাক্তার কবির আহমদ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যে নৌকা মার্কা লিফলেট নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতেন সেগুলো লুকিয়ে ফেলে এবং তার স্ত্রী আলমাছ খাতুন অনেক ফেলেও দেয়। তারপরেও রক্ষা হয় নি তাঁর। দেশের জন্য মায়াত্যাগ ত্যাগ করতে হয়েছে তাকে। নৌকা মার্কা সম্বলিত কবিরাজী ওষুধ, পকেটে নৌকা মার্কার লিফলেট থাকায় তারই দীর্ঘদিনের সহকর্মী , পাকিস্তানপন্থী সিরাজুল ইসলাম, পাঞ্জাবী পুলিশ মোহাম্মদ হোছেন রিপোর্ট করে তার নামে। কয়েকদিন যেতে না যেতে তাকে দেখিয়েও দেয় ওই সিরাজ ও হোছন। তাদের সহায়তা নভেম্বর মাসের কোনো এক শুক্রবার(তারিখটা আলমাছ খাতুন বলতে পারছেন না) বিকাল আনুমানিক ১টার দিকে কক্সবাজার শহরের বড়বাজার থেকে কবিরাজী ওষুধপত্রের মালামাল, ঘরের ছাউনির জন্য ওমপাতা সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি কিনে বাড়ি ফেরার পথে থানার রাস্তায় মাথায় পৌঁছলে ওৎপেতে থাকা সিরাজ ও মোহাম্মদ হোছেন কবির আহমদকে ধরে নিয়ে থানা নিয়ে যায়। থানায় নিয়ে গিয়ে তার পকেট তল্লাশি চালিয়ে নৌকা মার্কা সম্বলিত লিফলেট থাকায় দুঘণ্টার পর সিভিল রেস্ট হাউস সংলগ্ন পাক বাহিনীর টর্চার সেলে নিয়ে যায়। সেখানে ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে পাক বাহিনীর সদস্যরা তাকে চারজনকে এক সাথে গুলি করে হত্যা করে এক গর্তে পুতিয়ে ফেলে।

যে দিন কবির আহমদকে পাক বাহিনীর ধরে নেওয়ার পর দেড় ঘণ্টার পর এক রিক্সাওয়ালার মাধ্যমে খবর পেয়ে আলমাছ খাতুন তার স্বামীকে ফেরত পেতে তার বাবা ভাই খলিলুর রহমান, কবির আহমদের সাড়ে ৩ বছর বয়সী শিশু কন্যা শাহেনাজ আক্তার (বাবা শহিদ হওয়ায় আর্থিক কারণে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে সংসার জীবনে প্রবেশ করতে হয় শাহেনাজকে; শাহনাজ এখন যশোরস্থ শ্বাশুড় বাড়িতে আছেন) ও ৮ মাস বয়েসী শিশু নাছির উদ্দিন বাচ্চুকে নিয়ে তৎকালিন শান্তি ও কল্যাণ কাউন্সিলের কেন্দ্রিয় সভাপতি, প্রাক্তন মন্ত্রী মৌলভী ফরিদ আহমদের সাথে দেখা করতে কক্সবাজারস্থ বাসায় যায় কিন্তু তাকে বাসায় না পেয়ে মৌলভী ফরিদের ভাই নজির আহমদের সাথে দেখা করেন। নজির আহমদ আলমাছ খাতুন ও তার পরিবারের সকলকে কবির আহমদের কোনো কিছু হবে না বলে স্¦ান্ত¡না দেন। স্বান্ত¡না পেয়ে আলমাছ খাতুনেরা কোর্ট বিল্ডিংস্থ মিস্টির দোকানে আসলেই ৪টি গুলির আওয়াজ শুনতে পাই। সেদিনের বিমর্ষতার কথা শোনা যাক আলমাছ খাতুনের বয়ানে- ‘৪টি গুলির আওয়াজ শুনে আমার বাবা খলিলুর রহমান আমাকে জড়িয়ে ধরে এবং কান্নাকাটি করতে থাকে। তখন স্বামীর চিন্তায় মশকুল হয়ে যাই। পরক্ষণে বাসায় আসলে পাক বাহিনীতে বাবুর্চীর কাজ করা নতুন বাহারছড়ার ছগির আহমদ আমাদেরকে বলে আমার স্বামীসহ চারজন গুলি করে একই গর্তে পুতিয়ে ফেলেছে। এ খবর পেয়ে আমরা কন্যা শাহেনাজ ও ছেলে নাছির উদ্দিন বাচ্ছুকে নিয়ে ছুটে যাই সিভিল রেস্টহাউসে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্পে। ক্যাম্পের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আসিফ রেজভির সাথে আমি দেখা করি এবং তিনিও আমাকে খুঁজে বের করতে বলে এবং আমাকে স্বান্ত¡না দেন এভাবে-‘‘আমি থাকলে উনাকে মেরে ফেলা হতো না আমি ছিলাম না বিধায় আমার জুনিয়ররা তাকে মেরে ফেলেছে।’ এই বলে আমার সন্তানদ্বয়কে তিনি আদরও করেন।’ পরক্ষণে আমরা আমার স্বামীকে অনেক খুঁজতে থাকি কিন্তু এত কঙ্কাল, লাশ এবং বির্মর্ষ চেহারার মধ্যে আমার স্বামীকে খুঁজে পাইনি। আমার স্বামীর দাফন তো দূরের কথা লাশ পর্যন্ত পাইনি। তার পর আমার সব কিছুই শেষ। সেই থেকেই স্বামী হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলো নিয়ে কত যে কষ্ট আর যন্ত্রণায় কেটে গেলো আমার জীবন। জীবন বাচানোর জন্য শামুক ঝিনুক গেঁথে, মালা বানিয়ে বিক্রি করেছি। সুখে অসুখে ঝিনুক মালা গাঁথুনি ঠিকই ঠিক রেখেছি। এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছি।’
দেশ স্বাধীনের পর নিখোঁজ স্বামীকে পাবো এই আশায় সিভিল রেস্ট হাউস্থ বধ্যভূমিতে যায় এবং গিয়ে লাশের পর লাশ, মেয়েদের চুল, বেসিয়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রি এবং শতাধিক কঙ্কাল দেখে পাগলপ্রায় হয়ে যান কবির আহমদের স্ত্রী আলমাছ খাতুন। এসব দৃশ্যের বর্ণনা করতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মানসিকভাবে বিপর্যয় হয়ে যায় তিনি। তারপরেও থেমে তার স্বামীর অনুসন্ধান যাত্রার। তার বাবা খলিলূর রহমান ও ভাইকে খুঁজতে পাঠান চট্টগ্রাম ও টেকনাফে। কোথায় খুঁজে না পেয়ে অবশেষে নিশ্চিত হন তার স্বামী আর ফিরে আসবেন না। তার স্বামী ও সন্তানদেরকে এতই ভালোবাসতেন যে তার স্বামী শহিদ হওয়ার পর আর বিয়ে পর্যন্ত করেননি।
১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে কক্সবাজারে আসলে কবির আহমদের স্ত্রী আলমাছ খাতুনসহ শহিদ পরিবারের অনেকের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাদের বিপদে থাকার আশ্বাস দেন। এবং একটি সহানুভূতি পত্রসহ দুই হাজার একটি চেক তুলে দেন। ১৯৭৩ সালে শহীদ কবিরের স্ত্রী আলমাছ খাতুনকে দেয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত সহানুভুতি পত্রটি (স্মারক নং-পিএমআরএফ ৬/১০/৭২-ই.আই)১২৬৭ ১২.৪.১৯৭৩ হুবহু তুলে ধরা হলো:
‘প্রিয় ভাই বোন,
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য পুত্র/পিতা/স্বামী/ মা/ স্ত্রী আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভুতি।
এমন নিঃস্বার্থ মহান দেশপ্রেমিকের পুত্র/পিতা/স্বামী/ মা/ স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যি আপনি ধন্য হয়েছেন।
‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার পরিবারের সাহায্যার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ২০০০/= টাকার চেক প্রেরিত হলো। চেক নম্বর-০০৫৯৩৪।
আমার প্রাণ ভরা ভালবাসা ও শুভেচ্ছা নিন।
‘শেখ মুজিব’।

শহিদ কবির আহমদের সত্তরোর্ধ্ব আলমাছ খাতুন বলেন, এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। কোন রিলিফও পাই না। কক্সবাজার শহরের নতুন বাহারছড়া এলাকায় চারিদিকে বেড়া, উপরে পলিথিন আর নারিকেল পাতা ছাউনিযুক্ত ঝুপড়ি ঘরেই বসবাস করে দিনাতিপাত করছি। এ জায়গাটাও খাস কোন সময় নিয়ে যায় জানি না। তবে সরকারের কাছে আবেদন করেছি শহিদের স্ত্রী হিসেবে এ জায়গাটি আমাকে বন্দোবস্ত করে দিতে। যাতে স্বামীর স্মৃতি নিয়ে মরতে পারি।
আামার স্বামী বাজারে ওষুধ বিক্রি করতে, ফুটপাতে মজমা বসিয়ে কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার চালাতেন। স্বামী হারানোর পর একেবারে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। বেচে থাকার জন্য ৭০ বছর বয়সেও ঝিনুকের ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন। আয়ের আর কোনও ব্যবস্থা না থাকায় পরিবারের সদস্যদের অনাহারে অর্ধাহারে জীবন কাটছে। বয়স্ক ভাতাটুকুও জোটেনি আমার ভাগ্যে।’

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।