‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’ মৃধা আলাউদ্দিনের ভিন্নস্বাদের কবিতা

সাহেদ বিপ্লব
মৃধা আলাউদ্দিন কবিতার জন্য জীবনে অনেক পথ হেঁটে এসেছেন। বলা চলে অনেক কষ্ট করেছেন কবিতার জন্য। যতদূর জানি ২৫-৩০ বছর হবে তার কবিতা নিয়ে এগিয়ে চলা। আজ বলা যায় তার হাত দিয়ে বেশ কিছু ভালো কবিতা আসতে শুরু করেছে। আমরা যদি তার কবিতার দিকে একটু দৃষ্টি দেই তাহলে কী দেখতে পারি তার কবিতার ভেতর-বাহিরে। জীবন যুদ্ধে পরাজিত মানুষের কথা এসেছে মৃধার কবিতায়। ঠিক তেমনিভাবে মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছেন কবি তার কবিতার ভেতর দিয়ে-এমনকি কবিতা জীবন সাজাতে চেয়েছেন তিনি। বলা যায় স্বপ্ন দেখানো একজন কবি মৃধা আলাউদ্দিন। জীবন কীভাবে এগিয়ে নিতে হয়। সে কথা মৃধার কবিতার ভেতর আমরা পেয়ে যাই।
শুধু তাই নয় তার কবিতায় এসেছে প্রেমের কথা। ভালোবাসার কথা- আমরা তার কবিতার দিকে একটু দৃষ্টি দিলে দেখতে পারি নতুন পানিতে খলবল করা মাছের মতো প্রেমের কথা চলে এসেছে তার কবিতা ভেতর।
‘তোমাকে দারুণ লাগে
যখন তুমি কোর্তা-কামিজ
শাড়ি-চুড়ি
ওড়নাতে উড়তে থাকো
হাঁটতে থাকো মেঠোপথ
নদীর ধারে-দূর থেকে দূর-দিগন্তে
গোধুলী বেলায়
আলোর আঁধারে’।
এই যে লুকোচুরি খেলা তার কবিতা ভেতর দিয়ে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয় গ্রামের মেঠোপথ, নদী এখানে মৃধা আলাউদ্দিন সফল বলে আমাদের মনে হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের বাংলা সাহিত্যের যে সকল কবি নাম করেছে বাংলা সাহিত্য নিয়ে। সবাই কোনো না কোনো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু সেই সব কবি যখন শহরে আসে যখন সে তার গ্রাম ভুলে গিয়ে শহরের কবি হয়ে ওঠে কিন্তু মৃধা আলাউদ্দিন সেই পথে হাঁটেনি। তিনি শহর আর গ্রামকে এক সাথে মালাগাঁথতে চেয়েছেন।
মৃধা আলাউদ্দিনের লেখা ‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’ কাব্যগ্রন্থ পড়লাম অনেকগুলো কবিতা এই কাব্যগ্রহণে স্থান পেয়েছে। তবে আমার মনে হলো অনেক যাচাইবাছাই করে কবিতাগুলো এই ক্যাব্যগ্রন্থে স্থান দেয়া হয়েছে। সকল ধরনের কবিতা এই কাব্যগ্রন্থে এসেছে। নারীর রুপের বন্দনা যেমনভাবে নিয়েছেন ঠিক তার বিপরীদে দাঁড়িয়ে নারীকে সৎ হতে বলেছেন। আমি মনে করি কবিতা লিখলেই হবে না। তার ভেতর এমন কথাগুলো দিয়ে সাজাতে হবে। যেখানে জীবনের কথা, ক্ষয়িষ্ণু সমাজের কথা, মানুষের ব্যথা-বেদনার কথা- এমনকি মানষকে জাগানোর স্বপ্ন থাকতে হবে। মৃধা আলাউদ্দিন সেই পথে হাঁটছেন বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস
আমার কাছে আরও একটি বিশাল গুণ বলে মনে হলো মৃধা আলাউদ্দিনের এ ‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’ কাব্যগ্রন্থটিকে। আর তাহলো আকাশ আর মাটিকে এক সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন তিনি তার কবিতার ভেতর। এই কারণে তাকে আমি প্রেম, দ্রোহ ও মানুষের কবি বলতে একটুও দ্বিধা করি না। তার উদাহরণ স্বরূপ একটি কবিতা তুলে ধরতে পারি আমরা
আমি সেই সাঁকো ভেঙে চুরমার করে দেবো
যা আমাকে বাববার পৌঁছে দ্যায়
পিলসুজ প্রতারক পাপড়ির কাছে।
এভাবে কবিতায় হেঁটে চলেছেন নব্বইয়ে অন্যতম নিভৃতচারী কবি মৃধা আলাউদ্দিন। তিনি হাঁটছেন তার নিজের কবিতার ভূবনে। আমরা মনে করি তিনি তার প্রতিটি কবিতায় একটি করে নতুন ম্যাসেস দিয়ে থাকেন মানুষের জন্য। দেশের জন্য। মানুষ যেখানে সহজে প্রিয়তমাকে পেতে চায় কিন্তু মৃধা খুব সহজে পেতে চায়নি আর যদি চাইতেন তাহলে সাঁকো ভেঙে চুরমার করে দিতেন না। কেনো না সহজ কিছুর ভেতর কোনো সফলতা নেই।
মৃধা আলাউদ্দিন এই বইয়ের নাম এমনটা রাখলেন কেনো এটা আমাদের অনেকটা ভাবিয়ে তুলেছে। এমন তো বইয়ের নাম হবার কথা ছিলো না কিন্তু হয়েছে এই কারণে মানুষের যে পথে হাঁটার কথা ছিলো মানুষ সেই পেথে হাঁটছে না। মানুষ তার আসল পথ থেকে দূরে সরে গেছে। আর এখান থেকে সরে না আসতে পারলে মানুষের কপালে তেমন ভালো কিছু হবে না। প্রতারক ও নগ্ন রৌদ্রে পুড়ে পুড়ে একদিন শেষ হয়ে যেতে হবে।
কবি মৃধা আলাউদ্দিন মানুষকে সঠিক পথে ফিরে আসতে বলেছেন তার কবিতার ভেতর দিয়ে। আমরা তার একটি কবিতার দিকে চোখ বুলিয়ে নিতে পারি-
ওঠো সামনে যাও
‘শত সূর্ষের ঢাকনা খুলে রৌদ্র বাড়াও হাত
ঢেকে দাও ঘৃণিত ঘাম প্লেগ-পিপড়ে-চির্ণিত চা
এবঙ অনাগত শিশুর জন্য খুলে রাখো-
তুলে রাখো অই দূর মঞ্জিলে একা একটি
লাম্প, ল্যাগুস্কেপ…।
এভাবে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন নব্বইয়ের নিভৃতচারী, একা পথচলা কবি মৃধা আলাউদ্দিন। তিনি তার কবিতা ভেতর দিয়ে এই পৃথিবীর সকল মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন। ভালোবাসতে চেয়েছেন। স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছেন। তোমরা আর এভাবে ঘুমিয়ে না থেকে হাঁটতে থাকো রাত ও রোদ্দুরে। দুটি হাত বাড়িয়ে দাও সামনের শীতে তাহলেই জীবনে সফলতা আসবে। সজীবতা আসবে। আমরা বলবো কবি মৃধা আলাউদ্দিন কবিতাকে কবিতা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জীবনের সফলতা হিসেবে। সঘন সৌন্দর্য ষড়ৈশ্বর্য হিসেবে।
মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতায় প্রেম ও দ্রোহ-
‘বীক্ষ্যমাণ বশরাই গোলাপের আশীর্বাদে আমি পৌঁছে যাবো আমার গন্তব্যে
অমীমাংসিত কোনো সৌন্দর্যেও ভেতর আমি পৌঁছে যাবো
আমার ব্যথার বিড়ম্বনাসহ…

আমি গলে গলে যাব কোনো এক শান্ত-শুভ্র শ্রাবণ সন্ধ্যায়
আমাকে আর পাবে না
আমি গলে গলে যাবো
গলে গলে…’
‘এখন কি কিছুই করতে পারে না ওআইসি আরব লিগ অথবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন?
ওরা কি বোবা, নিথর, নিস্তব্ধ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা স্টাচু অব লিবার্টি?
হাস্যকর লেনিনের মূর্তি?
নাকি ওরা পেন্টাগন ও টুইন টাওয়ারের মতো ধ্বংসের ধোঁয়া
যা বরাবরই মিশে যেতে পছন্দ করে বৈষম্যময় নিষ্ঠুর পর্দার আড়ালে।
তবে ধ্বংস হোক জাতিসংঘ, তার সমস্ত অনুচর।
ব্যাঙের ছাতার মতো ধ্বংস হোক ওদের সভ্যতা
হেরে যাক বসরাই গোলাপের কাছে লাল, শাদা, প্রাচুর্যময় সবুজ গোলাপ…
প্রতারক পিতার মতো ধ্বংস হোক পৃথিবীর পচা ডিম অথবা এই জাতিসংঘ।
বুশ-ব্লেয়ার-শ্যারন কি একেকজন পিতা?
না, পিতা নয় ওরা ধ্বংসের প্রাচুর্য এবং অবশ্যই ওরা নিমিজ্জত হবে হুতামায়।
তুমি জানো হুতামা কি? হুতামা আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি;
যা জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে এবঙ লাগামাত্রই হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যায়।’
কবি মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতা পড়লে মানুষের জ্ঞান আলোচিত হবে। মানুষ এগিয়ে আসতে পারবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে। পোড়া রৌদ্দুওে আর পুড়তে হবে না। মানুষ তো আলোর পথযাত্রী- তাই আর ঘুমিয়ে নয় জীবনকে নিয়ে ভাবতে হবে। আশার প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে নিয়ে যেতে হবে অনেক দূর-প্রতিনিয়ত এমন প্রত্যাশা রাখেন কবি মৃধা। ২০২১ সালের একুশের বইমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে স্টুডেস্ট ওয়েজ। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে দুইশত টাকা। বর্তমানের মূল্য হিসাবে ঠিক আছে কিন্তু আরও একটু কম রাখলে ভালো হতো। প্রচ্ছদ ভালো হয়েছে কিন্তু ম্যাড, ইসপট করলে ভালো হতো এমনকি বইয়ের মান বৃদ্ধি পেতো। সেটা প্রকাশের নিজের ব্যাপার কিন্তু লেখক হিসেবে কবি মৃধা আলাউদ্দিন সফল বলেই আমরা মনে করি। ভালো ভালো কবিতা এই বইতে স্থান পেয়েছে। আমি এই বইটির বহু প্রচার-প্রসার ও সাফল্য কামনা করছি।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।