কক্সবাজার জেলা বাস্তবায়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আলম তৌহিদ

চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ প্রান্তের জনপদ রামুতে প্রথম প্রশাসনিক থানা স্থাপিত হয় ১৭৯৬ সালে। বর্তমান কক্সবাজার অঞ্চল অবধি ছিল রামুর প্রশাসনিক এলাকা। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তারা কাচারি পাহাড় এলাকা (বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভবন এলাকা) থেকেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। ১৭৯৯ সালের গোড়ার দিকে বৃটিশ ক্যাপটেন হিরাম কক্স অত্র অঞ্চলে আগমন করেন বার্মা থেকে আগত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়ে। তিনি বর্তমান কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে শরণার্থীদের পুনর্বাসন করেন এবং তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কেনাকাটার সুবিধার্থে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় ও পুনর্বাসিত রাখাইনদের মাঝে উক্ত বাজারটি ফালংজি নামে পরিচিত ছিল। ফালংজি শব্দের অর্থ সাহেব বাজার।

ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ক্যাপ্টেন কক্স ১৭৯৯ সালের আগস্ট মাসে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে ফালংজি নামটি পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয় কক্সেস বাজার (Cox`s Bazar)। ১৮৫৪ সালে রামু থানাকে কক্সবাজার থানায় রূপান্তরিত করা হয় এবং রামু পরিণত হয় কক্সবাজার থানার প্রশাসনিক অঞ্চল। সেই সময় রামুতে স্থাপন করা হয় একটি পুলিশ বিট । উক্ত বছর টেকনাফ, চকোরিয়া ও মহেশখালী নিয়ে গঠিত হয় কক্সবাজার মহকুমা । পরবর্তীতে টেকনাফ থানা থেকে উখিয়া থানা ও মহেশখালী থানা থেকে কুতুবদিয়া থানা সৃষ্টি করা হয়। ১৯০৮ সালে কক্সবাজার থানা প্রশাসন থেকে রামুকে বাদ দিয়ে রামু থানা গঠন করা হয়। ১৯৫৯ সালে গঠিত হয় কক্সবাজার টাউন কমিটি। ১৯৭২ সালে কক্সবাজার টাউন কমিটি বিলুপ্ত করে সৃষ্টি করা হয় কক্সবাজার পৌরসভা।

স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লেঃ জেঃ এইচ. এম. এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তিনি ক্ষমতায় আরোহন করেই গ্রহণ করেন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালা। এই নীতির আওতায় দেশের সবকটি থানা প্রশাসন উপজেলায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু মহকুমা সদর থানাগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো ও মর্যাদা কি হবে তা অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যায়। এভাবে কিছুদিন কাটার পর একটি কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার মহকুমা সদর থানাগুলোকেও উপজেলার সমমর্যাদার অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোতে অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের সকল মহকুমাবাসীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত প্রত্যাশা ছিল সরকার মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করবে এবং তাদের প্রাণের দাবীও ছিল ‘জেলা চাই’। আশাহত বেদনায় দেশের মহকুমাবাসীরা জেলার দাবীতে বিক্ষুদ্ধ আন্দোলনে নেমে পড়ে। কক্সবাজার মহকুমাবাসীও উপলব্ধি করতে পারে আন্দোলনের বিকল্প নেই।

কক্সবাজারেকে জেলায় রূপান্তরিত করার দাবীর সূত্রপাত কিন্তু তখন থেকে নয়। এর ইতিহাস আরো অতীতে প্রোথিত। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ‘কক্সবাজারকে জেলা চাই’ প্রথম দাবী উত্থাপন করেন মৌলভী ফরিদ আহমদ। স্বাধীনতা পরবর্তী জাতীয় সংসদে অনুরূপ দাবী তোলেন এডভোকেট নুর আহমদ, ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, ডাঃ শামশুদ্দিন চৌধুরী ও এডভোকেট জহিরুল ইসলাম প্রমূখ রাজনীতিবিদগণ।

১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে বাকশাল কর্মসুচির আওতায় বঙ্গবন্ধু দেশের ৬১টি মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করে প্রত্যেকটিতে একজন করে জেলা গভর্ণর নিয়োগের ঘোষণা দেন। এটি ছিল কক্সবাজার মহকুমাকে জেলা করার প্রথম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগে কক্সবাজার পুর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামোসহ জেলার সমমর্যাদার হতো কিনা সেব্যাপারে সন্দেহ ছিল। কিন্তু ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হলে সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। “কিন্তু কক্সবাজারের জন্য মনোনীত জেলা গভর্নর এডভোকেট জহিরুল ইসলামের মতে সেই অবকাঠামোর আওতায় জেলা জজ নিয়োগ সহ প্রতিটি মহকুমাকে পুর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত করা ঐ সরকারী নীতির অন্তর্ভূক্ত ছিল। তাঁর ভাষায় পার্থক্য যেটুকু ছিল তা শুধু জেলা প্রশাসনের শীর্ষে একেক জন জেলা গভর্নর নিয়োগ।” (প্রবন্ধ- কক্সবাজার জেলা : রূপান্তরের অন্তরালে-আবুল কালাম আজাদ/বদিউল আলম-কক্সবাজার জেলা বর্ষপুর্তি স্মারক)।

তৎকালীন ১০ লক্ষ কক্সবাজারবাসীর আবেগ-অনুভূতি-অধিকারের প্রতি একাত্ম হয়ে বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক ও ঢাকাস্থ কক্সবাজার সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জাফর আলম এবং খ্যাতিমান আইনজীবী চট্টগ্রামস্থ কক্সবাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিরুল কবির চৌধুরী স্ব স্ব সমিতির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীবর্গের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন জেলার দাবীতে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও একই দাবী উত্থাপন করেছিলেন সাংসদ বেগম ছালেহা খানম। তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন মোহাম্মদ রশিদ এম.পি, শাহজাহান চৌধুরী এম. পি ও মাহমুদুল করিম চৌধুরী এম.পি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কক্সবাজারকে জেলায় উন্নীত করার কথা দিলেও, তিনি কথা রাখেননি। অথচ তিনি কয়েকটি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করেন। এই আশাহত আঘাত কক্সবাজারবাসীকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ১৯৭৮ সালে মোহাম্মদ হোসেনকে আহবায়ক করে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট ‘কক্সবাজার জেলা বাস্তবায়ন’ কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে এই কমিটি একটি পুর্ণাঙ্গ কমিটির রূপলাভ করে। এই কমিটির সদস্যগণ হলেন-
সভাপতি-বেলাল উদ্দিন চৌধুরী
সহ-সভাপতি-ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী
” ” -এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর
সাধারণ সম্পাদক-এডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন
সহ-সাধারণ সম্পাদক-আব্বাস উদ্দিন চৌধুরী
” ” -নুরুল আজিজ চৌধুরী
” ” -নজরুল ইসলাম
প্রচার সম্পাদক-হেলাল উদ্দিন চৌধুরী
কোষাধ্যক্ষ-লিয়াকত নুর চৌধুরী
সদস্য-নুরুল আবছার, প্রিয়তোষ পাল পিন্টু, আবদুল হামিদ শমসের বেলাল, ছানাউল্লাহ সিকদার, বিশ্বজিত সেন, রঞ্জন পাল, আমিনুল হক চৌধুরী।

এই কমিটি কক্সবাজারকে জেলা চাই দাবীকে একটি আন্দোলনে রূপদান করে। থানা, ইউনিয়ন পর্যায়ে পথসভা-মিছিল-সমাবেশ করে। বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি-প্রতিকুলতা মোকাবিলা করে কমিটির সদস্যরা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার ও প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানকে স্মারকলিপি প্রদান করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থপন করেন। তবে নানা প্রতিকূলতার কারণে এই কমিটির আন্দোলন একসময় ঝিমিয়ে পড়ে। এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এই কমিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

লেঃ জেঃ এইচ. এম. এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৯৮৩ সালে জনৈক মন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে কক্সবাজার বিমান বন্দরে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক এস. এম. আমিনুল হক চৌধুরী ও এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তারা শলাপরামর্শ করে বিমান বন্দরে একটা বিক্ষোভ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিচলিত হয়ে পড়েন। তারপর তারা যোগাযোগ করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক বদিউল আলমের সাথে। তিনি এ ব্যাপারে সুধী মহলের সাথে আলাপ আলোচনা করেন। তারই একান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৮৩ সালের ১৪ নভেম্বর কক্সবাজারের সর্বস্তরের জনগণের এক সভা হয় কক্সবাজার প্রেসক্লাব ভবনে। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি এডভোকেট আবু আহমদ চৌধুরী। “সভায় আন্দোলনের স্বপক্ষে একাত্মতা ঘোষণা করে বক্তব্য রাখেন সর্বজনাব অধ্যক্ষ স আ ম শামসুল হুদা চৌধুরী, এডভোকেট নুর আহমদ, এডভোকেট ছালামত উল্লাহ, ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, বেগম ছালেহা খানম, এস এম আমিনুল হক চৌধুরী, এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এস এম কামাল উদ্দিন, জসিম উদ্দিন, আতাহার ইকবাল, ছিদ্দিক আহমদ খালবী, মোহাম্মদ আলী, শাহজাহান ও বদিউল আলম।” (প্রবন্ধ-কক্সবাজার জেলা : রূপান্তরের অন্তরালে-আবুল কালাম আজাদ/বদিউল আলম-কক্সবাজার জেলা বর্ষপুর্তি স্মারক)।

উক্ত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এডভোকেট আবু আহমদ চৌধুরীকে সভাপতি ও সাংবাদিক বদিউল আলমকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট ‘কক্সবাজার জেলা বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠিত হয়। এই কমিটি আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসুচি গ্রহণ করে। কমিটি গঠনের পর এডভোকেট আবু আহমদ চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি আর কোনো মিটিং, মিছিল, সমাবেশে উপস্থিত হতে পারেননি। আন্দোলন পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে সাংবাদিক বদিউল আলমের কাঁধে। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে কক্সবাজারের ৭টি উপজেলায় গড়ে ওঠে দুর্বার আন্দোলন। ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল পালন, সমাবেশ ও কক্সবাজার শহরে গণমিছিলের আয়োজন করা হয়। প্রায় ২০ হাজার লোকের স্বতঃস্ফুর্ত এই গণমিছিলটি ছিল কক্সবাজারের মিছিলের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। কক্সবাজারবাসীর আন্দোলনের চাপে অবশেষে সরকার নতিস্বীকার করে। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ কক্সবাজার জেলা উদ্বোধন দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়।

নতুন জেলা কক্সবাজারকে বরণ করে নেয়ার লক্ষ্যে অধ্যক্ষ স আ ম শামসুল হুদা চৌধুরীকে আহবায়ক ও সাংবাদিক বদিঊল আলমকে যুগ্ন আহবায়ক করে গঠিত হয় ‘কক্সবাজার জেলা উদ্বোধন ব্যবস্থাপনা পরিষদ’। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ বিকেল ৩টায় তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী শফিউল আযম কাছারী পাহাড় ময়দানে জেলা উদ্বোধন ব্যবস্থাপনা পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত ঐতিহাসিক জনসভায় আনুষ্ঠানিভাবে কক্সবাজার জেলার উদ্বোধন করেন।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।