শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন ও ভারতীয় মন

মনির ইউসুফ

শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন, জন্ম, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ ভারত। মৃত্যু ৯ জুন ২০১১ (বয়স ৯৫), লন্ডন যুক্তরাজ্য। পৃথিবীর সন্তান। অনন্য এক বেদনার শিল্পী। যৌধেয় বাল্মিকীর বংশধর, সেমেটিক-অসেমেটিক গিলগামেশের বংশধর; ভারতের ভূমিপুত্র। শিল্পের বেদনায় যার মনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রায় একশো বছরের পৃথিবী নিজের চোখে গভীরভাবে দেখে হাজার বছরের পৃথিবীকে হৃদয়বোধে এঁকেছিলেন তিনি। ভারতীয় চিত্র জগতে প্রাচ্য এশিয়ার আকাশ, মৃত্তিকা, হিমালয়, হংস, ঘোড়া, গনেশ, মহররম, নারী নদী ভারতের রূপকে এঁকেছেন শিল্পের আদিম ঐশ্বর্যে আর লিখেছেন কবিতা। সেই রূপান্তরের রসবোধ বুঝতে পারার মত যোগ্য সঙ্গী বা যোগ্য নাগরিক ভূ ভারতে হুসেনের সময়ে ছিল না। পুরো ভারতকে বোদলেয়ারের ‘সারমেয় ও আতরদান’ কবিতার দর্শনের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়। ফিদার ছবির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় জগত কত সুন্দর, কত গতিময়, আরও দূর, আরও দূর জগতের সীমানা শূন্যতা, বিন্দু, গতি, তেজ, সাহস, শিরদাঁড়া, কালের বাইরে যেন কালোত্তর। একটি মানবিক বিস্ময়বোধ নিজের ভেতর জাগ্রত হয়। ছবির গভীর ব্যাপ্তি টেনে ধরে মন, আত্মায় প্রলেপ দেয়। ফিদা ছবি আঁকতে আসার আগেই পৃথিবীতে ছবি নিয়ে তোলপাড় হয়ে গেছে অনেক, মানুষের মন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে পুঁজির অভিঘাতে। একদিকে আরাম আয়েশ আরেক দিকে তার ধাক্কা শ্রম পুজ, বর্জ্য, ক্লেদ, দানব,হিংস্রতা, শোষণ, শাসন, রক্ত। শিল্পবিপ্লবের ফলে লৌহজাত ভারী শিল্প ও কৃত্রিম প্লাস্টিক শিল্পের জয়যাত্রা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ ইত্যাদির নিষ্ঠুর হিংস্রতা মানুষ দেখেছে। পৃথিবী ফভিইজম এক্সপ্রেসেনিজম হয়ে স্যুররিয়ালিজমের বেদনায় পুড়েছে। পল দা মান ও দেরিদা দাঁত কিটমিট অধ্যাপকের দল সভ্যতাকে কেন্দ্রচ্যুত ও শিল্পকে বিষয়চ্যুত করে দিয়েছে। মানুষের এতদিনের গড়ে ওঠা পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার মধ্যে তারা ধরিয়ে দিল আগুন। তাদের মতবাদ তুললো তোলপাড়। সভ্যতা পুড়তে লাগলো সে আগুনে। পুঁজিবাদীরা সেই আগুনে ঘি ঢাললো। তারা আটলান্টিক সাগরের নোনা পানি ঢেলেও সে আগুন নেভাতে পারলো না। এভাবে কেটে গেলো এক শতাব্দীর কাছাকাছি।
অজন্তা আলতামিরা পুরোনো ও মানুষের বিস্ময়ের ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছে শুধু। যাদের চোখ উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদে অন্ধ, যাদের মনোভুবন অজ্ঞতার আধুনিকতায় নিমজ্জিত, বিশ্বাসের ভুবনটা হিংস্রবিশ্বাসে মোড়ানো। তারা শিল্পের মহৎ দায় বহন করবে কিভাবে। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না, তবে মনান্ধ বা আত্মান্ধ হলে প্রলয় ঘটে। একটি পৃথিবী কত জাতি দেশ, কত যুদ্ধ, বেদনা রক্ত, কত শিল্প ও শিল্পী তাদের মানবিক সংবেদনশীলতা উপর দাঁড়ায়। সামন্ত যুগ শেষ হলো, যুগের দাবি হলো দেশ দেশে জাতীয়তাবাদ জাগবে। কেননা, সামন্তীয় যুগে প্রতিষ্ঠিত স্কুল কলেজ বিশ্বিবদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্ররা পৃথিবীকে বুঝতে শুরু করলো। উপনিবেশগুলোতে পরাধীন তরুণেরা সশস্ত্র হামলা শুরু করলো। একদিকে স্বাধীনতা আরেকদিকে পুঁজির বিস্তার। পরদেশি লুটেরা চলে গেল, স্বদেশি লুটেরাদের যুগ শুরু হলো। পুঁজিবাদ কোন শুদ্ধ প্রজ্ঞার ধার ধারলো না।
পরাধীন ভারত দুটুকরো হয়ে স্বাধীন ভারত ও স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম নিয়েছে। সেই দুটুকরো আবার বাংলাদেশ নামে আরও একটুকরো হয়ে নতুন করে ভেঙে গেছে। এতে গেলো ভারত উপমহাদেশের কথা। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ল্যাতিন প্রায় সবদেশ রক্তাক্ত বেদনায় স্বাধীন হয়েছে। হুসেন জন্ম নিয়েছিলেন পরাধীন ভারতে। তার জন্মের পূর্বে পুঁজিবাদ সারা পৃথিবীকে প্রায় হজম করে ফেললো।

ইতিহাসে ভারতের বরাত বৈদিক আর্য, মোঘল, ব্রিটিশ দখলীসত্তার বরাত। এটা মনে করে কেউ কেউ ইতিহাস নিজেদের করে নিতে চাই, মনে রাখতে হবে ইতিহাস কোনো জাতির উত্তরাধিকার না; ইতিহাস মানবজাতির। পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডই কোন জাতির না, তাও মানবজাতির। প্রাচীনকালে মানবজাতির খণ্ডিত অংশীজন যেখানে যেখানে বাস করেছে, সেখানে সেখানে তাদের সম্মিলিত মেধা, মন, মগজ, মনন, সৃষ্টিশীলতা, যাপন, যুদ্ধ, লড়াইসহ প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার সূত্রে এক একটি টোটেম বা জাতিগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত হয়েছে। এই বিকাশের পথ ধরে সমাজ, জাতি, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। এটি মানব ইতিহাসের হাজার হাজার বছরের অনুভব, উপলব্ধি, সমাজ, টোটেম, ট্যাবু, কিচ্ছা, রূপকথা, গল্প, রক্ত, যাতনা, বাসনা, সঙ্গম-মিলন, ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে একটি জাতিসত্তা আরেকটি জাতিসত্তার উপর প্রভুত্ব কায়েম করে। এই প্রভুত্ব কায়েম করতে গিয়েই মানবজাতি পাকিয়েছে সব ঝামেলা। ইতিহাস বিকৃত করেছে, ইতিহাসকে অপমান করেছে, ইতিহাস মুছে দিয়েছে। লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বিজয়ী জাতিগোষ্ঠীসমূহের ইতিহাস।

ভারতের ইতিহাসের ক্ষেত্রে ব্রোঞ্জ যুগের ইতিহাস থেকে শুরু করে এই সময়ের ইতিহাসের যে ঘনঘটা তা না দেখে ইতিহাস বুঝতে গেলে ইতিহাসের সঠিকতা নিরূপনে বারবার ভুল হবে, একরৈখিক হবে। রোম যেমন একদিনে তৈরি হয় নাই এ কথা যেমন সর্বাংশে সত্য, তেমনি আরও বেশি করে সত্য হলো ভারতবর্ষও একদিনে তৈরি হয় নাই। ইন্দো ইরানিয়-ইন্দো ইউরোপিয় হুন, শক, চীনা, ভেট, রেড্ডি, মঙ্গোল মধ্য এশিয়ার যাযাবর, পশুপালকজাতিসহ এসবের সংকারায়নের মধ্যদিয়ে ভারতীয় জাতিসত্তা গঠিত হয়েছে। অলোচনার সুবিধার্থে ঐতিহাসিক প্রয়োজনে মধ্য এশিয়াসহ অন্যান্য ভারতীয় জাতিকেও হিসেবে নিতে হবে। পৃথিবীতে ভারতীয়রা বহুজাতিক, বহুমাত্রিক জাতি।
ভারত আর্যদের (ইন্দো ইরানীয়-ইন্দো ইউরোপিয়-শহ হুন ইয়ুচি চিন ভেড্ডি মঙ্গোল, সেমেটিক অনার্য ইত্যাদি) দখলে যাওয়ার পর আর্য-ব্রাহ্মণেরা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থছাড়া কখনও ভূ-ভারতের গণমানুষের স্বার্থ নিয়ে ভাবেনি। ঋগবেদের কালের মাঝামাঝি পর্বে একজন ব্রাহ্মণ বিয়ে করেছেন ষাট-সত্তরটি, দিনে দুটিও বিয়ে করেছেন তারা। বিয়ে করে নতুন বউয়ের মুখ না দেখে পণের টাকা বা গৃহস্থের গাভীটা নিয়ে চলে গেছেন। হাজার বছর ধরে ভারতীয় পুরুষরা তাদের বউকে সহমরণের চিতার আগুনে পুড়িয়েছেন। এক একটা জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা। জীবনকালে পুড়িয়েছেন তাতে পুষালো না, মরার সময়ও পুড়িয়ে মারলো। এ হচ্ছে ভারতীয় পুরুষের মন। এ মন বিশ্লেষণ করা দরকার। এমন মন কিভাবে তৈরি হলো, এমন নির্মম, নিষ্ঠুর মন! ইতিহাসের একটি সূত্র আমাদের সন্ধান দিচ্ছে যে শকরা-শক-স্থান বা মধ্য এশিয়ার শিস্তানের শক-আর্যরা নারীদের সহমরণে চিতায় পুড়াতেন। ভারতীয় আর্যরা পূর্বপুরুষের সেই প্রথা রেখে দিয়েছিল, কেননা মধ্য এশিয়ার এসব শকরা ভারতীয় আর্যদের পূর্বপুরুষ এক গোষ্ঠী। এখন ভারতীয় আর্যরা যেভাবে নিজেদের ভারতীয় বলে দাবী করছে তাতে মনে হয় এরা এখানকার ভূমিপুত্র। কিন্তু ইতিহাস কি বলে? ইতিহাস বলে তারাও নিরাপদ বাসস্থান, অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ভূমির খোঁজে অনেক যুদ্ধ লড়াই সাধনা এবং নিজেদের প্রথার সমপর্ণের মধ্য দিয়ে সপ্তসিন্ধু তীর বা ভারতে স্থায়ী হয়েছে।

আমার আজকের বিষয় ইতিহাস নয়, একজন শিল্পী। তাই ইতিহাসের অত গভীরে যাওয়ার কোসেস করছি না। বলতে চাচ্ছি, মানুষের টিকে থাকার প্রশ্নগুলো কত বিস্ময়করভাবে জটিল, প্রাচীন কালে গোষ্ঠিসমূহের মধ্যে সারাক্ষণ লড়াই, যুদ্ধ, হামলা, রক্ত লেগেই থাকতো। সে হাজার হাজার বছর আমরা পেরিয়ে এসেছি। ইতিহাসে কত ঘটনা কত রকমভাবে ঘটেছে। তারপরও কেন এ প্রশ্নের মীমাংসা হচ্ছে না, মুসলমানরা ভারতীয়-হিন্দুরা যেমন ভারতীয়। এই প্রশ্নে ভারত তিনভাগ হলো, ভারত কি আরও টুকরো টুকরো হতে চায়। তবে ভারতের কপালে আরও দুঃখ আছে। রাজনৈতিকভাবে ভারতীয় হিন্দুরা যদি ভারতীয় মুসলমানদের হাজার বছর পরও বহিরাগত মনে করে তাহলে ভারতকে হারাতে হবে আরও ভূমি-ভূমা। তাই এ বিষয়ে রাজনৈতিক মীমাংসা করে ভারতকে দাঁড়াতে হবে বিশ্বের সামনে। তা নাহলে মানবহিংসায় ভারত জ্বলবে। জ্বলবে দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ।

মকবুল ফিদা হেসেন ভারতীয় শিল্পী। বিশ্বিবিখ্যাত। শিল্পের জগতে আধুনিক ভারতকে দিয়েছেন নতুন গতি। তার শিল্পে ভারতীয় পুরাণ, বেদ, উপনিষদ, মহাভারত, রামায়ণ, কুরান, আরবীয় ঘোড়া যেমন পরিব্যাপ্ত হয়েছে, তেমনিভাবে ফুল পাখি, ধ্যান, নির্বাণও পরিব্যাপ্ত হয়েছে মানব মহিমার নতুন আশায়। কিন্তু ভারতীয় আর্যহিংসুটে মন, হিন্দুত্ববাদী সনাতন ধর্মের কায়েমী স্বার্থের লোকজন সেটা নিতে পারেনি। তারা সাধারণ মানুষকে উসকে দিয়ে একালেও শিল্পের গতি রুদ্ধ করেছে। শিল্পের মানবিক স্বাধীনতা, শিল্পীর সৌকর্যময় জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তারা হিদুত্ব ও ধর্মে মজেছে সঙ্গে পাঁচমিশালী প্রতিক্রিয়াশীলতা। ভারতীয় জাতি, মানবজাতি এমন বড় করে ভাবার মত তাদের মনই তৈরি করতে পারেনি, অথচ ভারত কত বড় মহাভারত। এখানে মনে রাখতে হবে রাজা রামমোহন রায়, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যারা ভারতীয় জাতিকে মুক্তি দিয়েছিলেন, তারা সত্যিকারের ভারত নিয়ে ভেবেছিলেন। কিন্তু অন্যরা ভারত নিয়ে ভাবতেই পারেনি। মকবুল ফিদা হুসেন শিল্পী হিসেবে মহাভারত নিয়ে ভেবেছেন। কেননা, তিনি ভারতে জন্মেছিলেন। আর বেড়ে উঠেছিলেন তার জলবাযু-আবহাওয়ায়। কার পূর্বপুরুষ কখন কোন ভূখণ্ডে এসে বসবাস করেছিল বলে তার উত্তর পুরুষদের সে দায় বহন করতে হবে তা চিন্তাশীল মানুষদের জানা নেই। যারা এই কথা বলে তারা কারা তারা কি মদন, চোদন না গগন। পৃথিবীতে এখনও কোন চিন্তার মীমাংসা হয় নাই। কিন্তু চিন্তার নৈরাজ্য আমরা দেখেছি। প্রাচ্য প্রতীচ্যের সব জায়গায় চিন্তা ও ধর্মীয় নৈরাজ্য। তাহলে মানুষ কিভাবে শিল্পের মহত্ত্বকে বুঝতে পারবে। যেখানে সমাজকে রাখা হয়েছে প্রলোভনের ভেতর, নিষেধের ভেতর। তাই সমাজ আগাই নাই, স্বপ্ন পুড়েছে, কল্পনার জগত ছোট হয়ে পড়েছে। ভারতের মানুষের স্বপ্ন ও কল্পনা করার কোন জগত নেই বলে ইউরোপিয় জগতে তাদের বসবাস করতে হয়। আর ইউরোপ বাস করে তাদের নিজস্ব জগতে। কিন্তু হাজার বছরের ভারতীয় মনের সংবেদ কোন সংহিতা কি কোন রূপ সৌন্দর্য দানা বাঁধতে পারে নাই। তা নাহলে সভ্যতার এই সময়ে এসে একজন শিল্পীকে কেন দেশত্যাগ করতে হয়েছে। সভ্য ভারত তার উত্তর প্রজন্মকে কি জবাব দেবে? প্রাচীন ও মধ্যযুগে না হয় মানুষের বিকাশের কালপর্ব ছিল, কিন্তু আধুনিক কালপর্বে এ কেমন নিষ্ঠুর সভ্যতা, সংস্কৃতি। স্পিনোজা, ব্রুনো, জোয়ান অর্ব আর্ক, গ্যালিলিও, সক্রেটিস, প্লেটো, ইবনে সিনা, ইবনে খালদুন, মসনুর হাল্লাজ, শারমান শহীদ এসব জ্ঞানপুত্রদের পৃথিবী বুঝতে পারে নাই মেনে নিলাম, তাদের ইতিহাস আমাদের সামনে থাকতে কেন ভারত মকবুল ফিদা হুসেনের প্রতি-বাংলাদেশ তছলিমা নাসরিনের প্রতি এতটুকু সম্ভ্রম দেখাতে পারল না, যে তাদেরই সন্তান মকবুল ফিদা, তছলিমা নাসরিনকে নির্বাসনে পাঠালো। গণপ্রজাতন্ত্র কেন? তাহলে রাজা কে? এই পুঁজিবাদী সমাজে সামন্তীয় যুগ শেষে মানুষ প্রজা হবে কেন? তাহলে নিশ্চয় রাজা আছে? বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল জনগণ স্বাধীন হবে, ভারত স্বাধীন হয়েছিল জনগণ স্বাধীন হবে কিন্তু স্বাধীনতাটাই জিম্মি হয়ে গেল কয়েকজন দেবপুত্রদের হাতে। তারা সেই রাজা-বাদশা যাদের সময় মানুষ ছিল সম্পূর্ণই পরাধীন, তারা নিজের কথা বলতে পারতো না, তাদের মুখ দিয়ে রাজার কথাটিই বলতে হতো। এই দ্বাবিংশতি যুগেও মানুষের সেই পরাধীনতার কি অবসান হয়েছে! হয় নাই। হয় নাই বলে এখনও গণপ্রজাতন্ত্র লেখা থাকে সংবিধানে। শাসকেরা সেই রাজাই থেকে যায়। জিম্মি করে ফেলে তাদের শাসিত স্ব স্ব অঞ্চল। সভ্যতার ক্রমবিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
হাজার বছরের প্রতিহিংসার শিকার হলেন মকবুল ফিদাও। ভারতীয় হিংস্র মনের আগুনে পুড়তে হলো এই মহান শিল্পীকে। সহমরণের চিতায় পুড়িয়ে মারার যে কৌশল ভারতীয় পুরুষেরা নিয়েছিল, ভারতীয় নারীরা আর্য দাবী করা ভারতীয় পুরুষের কাছে এখনও তার কোন কৈফিয়ৎ চাইতে পারে নাই। কি আশ্চর্য! ধর্মের নামে এই বর্বরতা চাপিয়ে দিয়েছে যারা তারা এখনও ঐ জনগণকে নিয়ে ধর্ম ধর্ম খেলছে। মুসলমানদের বহিরাগত বলে যে ভাষায় ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে উপমহাদেশে ইতিহাসজ্ঞানের একটা অক্ষরও যদি কারো জানা থাকে তাহলে তিনি এই বিষয়টা বুঝতে পারবেন। পাঁচ হাজার পাঁচশো বছর আগে যারা ইন্দো-ইরানীয়, ইন্দো ইউরোপিয় জরথুস্ত্রীয় তারা সিরিয়া, ব্যবিলন, মধ্য এশিয়ার কোন ভূমি থেকে এ ভূমিতে এসেছিল। দেখতে পারেন রাহুল সাংকৃত্যায়নরে মধ্য এশিয়ার ইতিহাস, ইরফান হাবিবের বৈদকি সভ্যতা বা আরও আরও ইতিহাসের বই। মানুষের ইতিহাস যেহেতু ভূখণ্ড দখলের ইতিহাস সেহেতু এসব বিষয় কবে মীমাংসা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হল না। হীনমন্যতা জারি থাকলো। মকবুল ফিদাকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো আর বাংলাদেশ তসলিমাকে নির্বাসন দণ্ড। কি তাদের অপরাধ!
ভারত মাতা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ গঙ্গা যমুনা, মহররম, গনেশ, দুর্গা বৈদিক ভারত ও অবৈদিক ভারতকে নতুন করে আবিষ্কার করার পরও হুসেনকে শিকার হতে হয়েছে ধর্মান্ধ মৌলবাদী হিংস্রতার। এদিক থেকে দেলক্রিয়া, পিকাসো, দালি, সেজান, মনে, পল ক্লি কতটা ভাগ্যবান। আর গঁগ্যা, ভ্যান গগ, ফিদা কতটা অসহায়।

স্কটিশ কবি ম্যাক ডিয়ারমিদ তাঁর খধসবহঃ ঋড়ৎ এৎবধঃ গঁংরপ- এ লিখেছেন নিছক বেঁচে থাকার যে লড়াই তা শেষ হয়েছে, সে যুদ্ধে জিতেছি আমরা। ফুরিয়েছে অবদমন আর নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজন।এখন শুরু সত্যের জন্য লড়াই আর লড়াই সেই বর্ণাতীত প্রয়োজনের জন্য যার নাম সৌন্দর্য যা অন্য কোন ছোটখাটো তুচ্ছ প্রয়োজন দ্বারা ব্যাহত না হয়। নিজের পরম আকাঙ্ক্ষা চেয়ে কম বেঁচে থাকার, তার চেয়ে কম কিছু হওয়ার প্রয়োজন আর নেই মানুষের। (‘পণ্য ও মানুষ’ – জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি- অমর্ত্য সেন)

‘পণ্য ও মানুষ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে অমর্ত্য সেন মানুষের জীবনাযাত্রার মান নির্ধারণে এই বিষয়ের উপর আলোচনা করেছেন। মানুষের বাস্তবিক প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনের বিষয়ে তিনি এখানে নতুন করে বিশ্লেষণও করেছেন। আমরা দেখেছি ইউরোপ আমেরিকায় মানুষের বেঁচে থাকার যে সত্য, তার বাইরের পৃথিবীর বেঁচে থাকার যে সত্য তা কিন্তু এক নয়; যোজন যোজন ফারাক। আমেরিকা ও ইউরোপের চিন্তার প্যাটার্ন এক রকম, আর এশিয় তথা বাকী পৃথিবীর চিন্তার প্যাটার্ন আরেক রকম। সেখানে বসবাসের মান, মাথাপিছু আয়, সুশাসন, কায়েমী স্বার্থ ভিন্ন ভিন্ন। আমেরিকা কর্পোরেটোক্রাসির স্রষ্টা আর এশিয়া বা তার বাইরের দেশসমূহ সেই কর্পোরেটোক্রাসির ভোক্তা ও শিকার। তাই, অমর্ত্য সেন ম্যাক ডিয়ারমিদের এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, ‘হয়তো কোন বিশেষ অর্থে ‘পরম আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কম বেঁচে থাকার, তার চেয়ে কম কিছু হওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এ এক মর্মান্তিক সত্য যে, সেই আদর্শ জীবন থেকে অনেক পিছনে পড়ে আছে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ। যে সব দেশ ধনী, সেখানে প্রত্যাশিত আয়ু পঁচাত্তর বছরের কাছাকাছি। কিন্তু অল্প আয়ের দেশগুলিতে পরিস্থিতি আলাদা। তাদের দুই-তৃতীয়াংশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু পঞ্চাশ বছরেরও কম। হাসপাতালের অথবা নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ পায় না পৃথিবীর জনসাধরণের বিপুল অংশ, বিশুদ্ধ জলের নিরাপত্তা থেকেও বঞ্চিত তারা। বেশির ভাগ গরীব দেশের সাক্ষরতার হার ভয়াবহ রকমে নিচু। এমন কি ধনী দেশেও অপেক্ষাকৃত দরিদ্রের জীবনে নানারকম অস্বাচ্ছন্দ্যের অন্ত নেই। পরম আকাঙ্ক্ষার যে জীবন, তার চেয়ে গৌণ এক বেঁচে থাকা, তার চেয় গৌণ এক পরিচয়- এই বাধ্যতা থেকে যে রেহাই পাবে মানবজাতির এক বিরাট অংশের তেমন উপায় নেই।

সভ্যতা বা শিল্পের আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত ছিল মানুষের মুক্তি, কিন্তু তা না হয়ে হয়েছে আমাদের বিজয় আর আদার বা অপরের পরাজয়। ম্যাক ডিয়ারমিদ কি বলছে- আমাদের কবি, শিল্পীরা কি তা বুঝতে পেরেছে! শিল্পের সঘন সৌন্দর্য কোথায় লুকিয়ে থাকে পুঁজিবাদী প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শিল্পের জন্য শিল্পে না পুঁজিবাদী প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের রক্ত দিয়ে শ্রম দিয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতায়। কিন্তু ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তান নেপাল বা এশিয়ায় শিল্পের জন্য শিল্পও যদি করতো তাহলেও মানুষের মনের বিকাশ বুঝা যেত। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শিল্পীদের মত এখানে গড়ে উঠেছে দলীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, সিনেমা আর তাকেই বলা হচ্ছে জাতীয় সংস্কৃতি। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না। আত্মান্ধ, মনান্ধ ও মুর্খ থেকে গেল প্রলয় ঘটে। এখন তাই ঘটছে। জাতীয়তাবাদী দেশগুলো নিজ নিজ আদর্শ নিয়ে স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীনতার সে সব মহান মুক্তির গৎবাধা বুলি কোথায় হারিয়ে গেল। পুঁজিবাদের দেশে কোন আদর্শ লক্ষ নেই ফুর্তি ছাড়া। ভারতের মানুষের প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল স্বাধীনতার সত্তর বছরের পরও কেন মানুষ ভাত পায় না, দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে দেশের সত্তর ভাগ মানুষ তাদের ভাতের জোগাড় করতে পারে না কেন? সেখানে হুজুগী ভারতীয়রা ধর্ম নিয়ে মেতেছে। ধর্মের হিংস্রতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। মুসলমানদের উচ্ছেদ করার তালে নেমেছে। শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনও একজন মুসলমান, কিন্তু মকবুল ফিদা হুসেন শুধু কি মুসলমান তিনি তো শিল্পী, তিনি তো সংবেদনশীল মানুষও তা আর কেউ আমলেই নিল না। তাকেও সেই বৈদিক হিংস্রতার শিকার হতে হলো।
মানব মুক্তির মহান শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনকেও হিংস্রতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। আহা, মকবুল ফিদা হুসেন। শেষ বয়সে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। ভারতীয় মনের এই অপরাধ ক্ষমা করা যায় না। শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন সপ্তসিন্ধুর ঢালু বেয়ে নামা ভারতের খরস্রোতা পাথুরে নদীর ভূমিপুত্র। যার তীরমন অনন্তকে ছুঁয়েছে। মকবুল ফিদা হুসেনও তার সৃজনচিত্র দিয়ে অনন্তকে ছুঁয়েছে, মানব মনের বেদনাকে ছুঁয়েছে।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।