আহমদ ছফার জন্ম‌দিন এবং তাঁর কবর‌ ক্রেতার প্রয়াণ

নূরুল আ‌নোয়ার

কা‌ছের মানুষ যখন পৃথিবী ছে‌ড়ে চ‌লে যায় তখন তার কা‌ছে জন্ম‌দিনই কি মৃত‌্যু‌দিনই কি, দু‌টোই তার কা‌ছে ক‌ষ্টের। আ‌মি কি কখনও সে দিন‌টি ফি‌রে পাব যে‌ দিন‌টি‌তে শাগবাগের ফু‌লের দোকা‌ন থে‌কে ফুল কি‌নে এ‌নে আহমদ ছফার পড়ার টে‌বি‌লে ফুলদা‌নি‌তে সা‌জি‌য়ে রাখতাম? আ‌মি কি পারব জন্ম‌দি‌নে যারা আস‌তেন তা‌দের চা নাস্তা দি‌য়ে আপ‌্যায়ন কর‌তে? না আ‌মি পারব না। সুতরাং আহমদ ছফার জস্ম‌দিন এখন আমা‌কে আর আনন্দ দেয় না। যে‌দিন তি‌নি এ ধরাধাম থে‌কে বিদায় নি‌লেন সে‌দিনই তাঁর জন্ম এবং মৃত‌্যু আমার কা‌ছে সমার্থক হ‌য়ে গে‌ছে। মৃত‌্যু‌দিনের বিষণ্নতা আমা‌কে যেভা‌বে ‌ঘি‌রে ধ‌রে আচ্ছন্ন ক‌রে রা‌খে, একইভা‌বে তাঁর জন্ম‌দি‌নের নানাস্মৃ‌তি ভিড় ক‌রে আমা‌কে কাঁদায়।
আজ আহমদ ছফার ৮০তম জন্ম‌দিন। ১৯৪৩ সা‌লের হিসা‌বে এ‌টি। আহমদ ছফা স্বীকার ক‌রে‌ছেন এটা তাঁর স্কুল সা‌র্টিফি‌কে‌টের বছর, মূলত তি‌নি জ‌ন্মে‌ছি‌লেন ১৯৪২ সা‌লে। সে‌টি‌কে গণায় নিলে এ‌টি তাঁর ৮১তম জন্ম‌দিন, অর্থাৎ আহমদ ছফা আজ বে‌ঁচে থাক‌লে তাঁর বয়স হ‌তো ৮০ বছর। এমনও ধ‌রে নি‌তে পা‌রি ৮০তম জন্মবা‌র্ষিকী। সে হি‌সে‌বে ৮০তম জন্মবা‌র্ষিকীর এক‌টি গুরুত্ব র‌য়ে‌ছে বৈ‌কি।
আহমদ ছফার জন্ম কিংবা মৃত‌্যু‌দিব‌সে ঘটনাচ‌ক্রে আমা‌কে প্রায় বছর ঢাকার বাই‌রে থাক‌তে হয়। এবারও তার ব‌্যতিক্রম ঘটে‌নি। আজ আহমদ ছফার জন্ম‌দিন, সে‌টি আমার আ‌গে থে‌কে ম‌নে ছিল। আমার ব‌্যস্ততা, শরীর আর ম‌নের অবসন্নতার কার‌ণে কোনকিছু‌তে আ‌মি স্বতঃস্ফূর্ততা খুঁ‌জে পা‌চ্ছিলাম না। কিন্তু কা‌জের ফাঁ‌কে ফাঁ‌কে আ‌মি যথন ফেসবু‌কে ঢু মার‌ছিলাম তখন দেখ‌তে পেলাম অ‌নে‌কে আহমদ ছফা‌কে জানা‌নো জন্ম‌দি‌নের শ্রদ্ধাঞ্জ‌লি আমার টাইম লাই‌নে এ‌সে ভিড় ক‌রে‌ছে। কিন্তু এসব দেখার পরও আমার ভেতর থে‌কে নিষ্ক্রীয় ভাবটা কোনভা‌বে কাটল না। ওই যে বললাম, আহমদ ছফার জন্ম‌দিন আর মৃত‌্যু‌দিন আমার কা‌ছে সমার্থক, সেটাই মনটা‌কে আরও বে‌শি ভারাক্রান্ত ক‌রে তুলে‌ছে।
দু‌দিন ধরে মুষলধা‌রে বৃ‌ষ্টি। কিছু সময় থে‌মে থেকে আবার ঝ‌রে চ‌লে। এটা‌ও আমার কা‌ছে এক কষ্ট হ‌য়ে দাঁড়ায়।
ম‌ানু‌ষের ম‌ন সীমানা মা‌নে না, কখন কোন‌দি‌কে ছু‌টে বলা মুশ‌কিল। এমন ঝুমবৃ‌ষ্টি‌তে আমার ম‌নে পড়ল, একবার অ‌ঘোর বরষায় আহমদ ছফার খুব জ্বর হ‌য়ে‌ছিল। জ্ব‌রে তি‌নি কোঁকা‌চ্ছি‌লেন। মা‌ঝে মা‌ঝে জ্ব‌রের প্রচণ্ডতায় প্রলাপ ব‌কে যা‌চ্ছি‌লেন। মা‌ঝে মা‌ঝে জলপ‌ট্টি দি‌য়ে তাঁর কপা‌লের তাপ কমা‌নোর চেষ্টা কর‌ছিলাম। যতক্ষণ প‌ট্টির কাজ চা‌লি‌য়ে যেতাম ততক্ষণ তি‌নি চুপ থাক‌তেন। জলপ‌ট্টি দেওয়া বন্ধ ক‌রে দি‌লে কিছুক্ষণ পর আবার নানাকথা ব‌লে যে‌তেন। মা‌ঝে মা‌ঝে চিকন গলায় `মা’ ব‌লে চিৎকার দি‌তেন। এক সময় আমা‌কে ‌তি‌নি ডেকে বল‌লেন, বাই‌রে কী সুন্দর বৃ‌ষ্টি! শরী‌রের জ্বর আমাকে বৃ‌ষ্টি দেখা থে‌কে ব‌ঞ্চিত করল। এ বৃ‌ষ্টির দিনে আমার জন্ম। এ বৃ‌ষ্টি‌তে ভিজ‌লে আমার জ্বর থাক‌বে না। আ‌মি বৃ‌ষ্টি‌তে ভিজ‌তে চাই।
আ‌মি বললাম, বৃ‌ষ্টি‌তে ভিজ‌লে কি অবস্থা হ‌বে বুঝ‌তে পা‌রেন?
কি হ‌বে, মারা যাব এই তো?
আ‌মি পুনরায় কপা‌লে জলপ‌ট্টি দি‌য়ে তাঁ‌কে চুপ ক‌রে রাখার চেষ্টা করলাম।
কা‌ছের মানু‌ষেরা যখন চ‌লে যায় তখন তাদের নি‌য়ে ঘ‌টে যাওয়া ছোট ঘটনা‌টিও বু‌কের ভেতর বড় করে ঘা দেয়। এই যে দু‌দিন ধ‌রে অনবরত বৃ‌ষ্টি ঝর‌ছে সে‌টিও অ‌নেক কিছু ম‌নে ক‌রি‌য়ে ‌দি‌য়ে কষ্ট বা‌ড়ি‌য়ে দিল।
আজ আহমদ ছফার জন্ম‌দিন। তা‌ঁ‌কে নি‌য়ে আজ কিছু লিখব না মন‌স্থির ক‌রে‌ছিলাম। হঠাৎ এক‌টি দুঃসংবাদ আমা‌কে এত কষ্ট দিল আ‌মি কিছু‌তে নি‌জে‌কে স্থির রাখ‌তে পারি‌নি। জিয়াউল ইসলা‌ম না‌মের এক বড় ভাই আমা‌দের স‌ঙ্গে কাজ কর‌তেন। প‌রে ঢাকা ক‌মিউ‌নি‌টি মে‌ডি‌কেল হস‌পিটা‌লে নি‌য়োগ পান। অ‌নেক বছর ধ‌রে ওখা‌নে দা‌য়িত্বরত ছি‌লেন। গতরা‌তে তি‌নি মারা গে‌ছেন। এ সংবাদ‌টি শোনার পর থে‌কে আমার বু‌কের ভেতরটা হু হু ক‌রে কাঁদ‌ছে। এ মানুষ‌টি আমার যত উপকার ক‌রে‌ছেন আ‌মি তাঁর জন‌্য কোন‌দিন কিছুই ক‌রি‌নি। যখনই আ‌মি তাঁর কা‌ছে নানাকা‌জে ছু‌টে গি‌য়ে‌ছি তি‌নি কখনওই নিরাশ ক‌রেন‌নি। শুধু আ‌মি নই, যে কারও ব‌্যাপা‌রে কিছু কর‌তে পার‌লে তি‌নি নি‌জে‌কে ধন‌্য ম‌নে কর‌তেন। তাঁর হা‌স্যোজ্জ্বল মুখ‌টি এখন আ‌মার চো‌খে সাম‌নে বড় ক‌ষ্ট হ‌য়ে ভাস‌ছে।
আরও এক‌টি কার‌ণে তি‌নি আমার কা‌ছে শ্রদ্ধার জায়গা‌য় আসন গ‌ড়ে‌ছেন। আহমদ ছফা যখন মারা যান তখন এই জিয়াউল ইসলামই আহমদ ছফা‌কে দাফ‌নের কব‌রের জন‌্য নানা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ ক‌রে‌ছি‌লেন। আহমদ ছফা‌কে বু‌দ্ধিজীবী কবরস্থা‌নে দাফ‌নের জন‌্য তাঁ‌কে পাঠা‌নো হ‌য়ে‌ছিল। আহমদ ছফার কবর চাই‌তে গি‌য়ে তাঁ‌কে নিরাশ হ‌য়ে ফি‌রে আস‌তে হ‌য়ে‌ছিল। মু‌ক্তিযুদ্ধ সংস‌দের কমান্ডার আহাদ চৌধুরী প্রশ্ন তু‌লে‌ছি‌লেন, আহমদ ছফা কোথায় মু‌ক্তিযুদ্ধ ক‌রে‌ছে?
আহমদ ছফা‌কে বু‌দ্ধিজীবী‌ কবরস্থা‌নে কব‌রের জায়গা না দেওয়ায় তি‌নি খুবই মর্মাহত হ‌য়ে‌ছি‌লেন। সংবাদ‌টি শু‌নে যাঁরা তাঁ‌কে পা‌ঠি‌য়ে‌ছি‌লেন তাঁরাও হতবাক হন। হয়‌তো চাপাচা‌পি কর‌লে আহমদ ছফা‌কে বু‌দ্ধিজীবী কবরস্থা‌নে দাফন করা যেত। কিন্তু তাঁরা সে‌টি কর‌তে চাই‌লেন না। তাঁদের ভাব‌তে হ‌য়ে‌ছিল, জোরাজু‌রি ক‌রে আহমদ ছফার জন‌্য কবর ভিক্ষা চাওয়াটা সম্মা‌নের নয়, এ‌টি তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। প‌রে সেই জিয়াউল ইসলামকে দি‌য়ে মিরপুর কবরস্থান থে‌কে কবর কি‌নে আহমদ ছফা‌কে দাফন কর‌তে হ‌য়ে‌ছিল।
কা‌লের সা‌ক্ষি জিয়াউল ইসলাম আজ পরপা‌রে।
জিয়া ভাই, ভা‌লো থে‌কো। পরকা‌লে একে অপ‌রের স‌ঙ্গে দেখা হয় কি না জানা নেই, য‌দি আহমদ ছফার স‌ঙ্গে দেখা হয় ব‌লো, বু‌দ্ধিজীবী কবরস্থা‌নে তোমা‌কে দাফন করা না গে‌লেও সাধারণ কবরস্থা‌নে দাফন করার কার‌ণে তোমার এতটুকু অসম্মান হয়‌নি। ব‌লো, তাঁর কবর‌টির যা‌তে অমর্যাদা না হয় তার সাধ‌্যসাধনা আ‌মি ক‌রছি।
আহমদ ছফার জন্ম‌দিন এবং জিয়া ভাই‌য়ের অকাল প্রয়া‌ণ দু‌টো‌তেই আমার শ্রদ্ধাঞ্জ‌লি।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।