রোহিঙ্গাদের নেপথ্যে কারা?

-আম্মার জাকারিয়া :

ভূমিকা: নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গারা বিশ্বে অন্যতম নির্যাতিত, দূর্ভাগা ও অধিকার বঞ্চিত জাতি। মিয়ানমার সরকার ও তাদের জনগন কর্তৃক নির্যাতিত হওয়ার এমন ভয়াবহ চিত্র বিশ্ব খুব একটা বেশি দেখেছে বলে মনে হয় না। উদ্বাস্তু, নিঃস্ব ও নিপীড়িত এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশকে তাদের নিকটতম আশ্রয়স্থল ও একমাত্র ভরসার জায়গা মনে করে আসছে অনেক আগ থেকেই। ফলে যখনই তারা জাতিগত নিধন ও নির্যাতনের শিকার হয়, তখনই তারা বাংলাদেশে ছুটে আসে। ১৯৭০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা প্রায় এক মিলিয়নেরও বেশিতে এসে ঠেকেছে।
প্রথম দিকে তাদের অবস্থা আশংকাজনক হলেও ধীরে ধীরে তারা তাদের সামাজিক অবস্থানকে পাকাপোক্ত করে তোলে। টেকনাফ, উখিয়া সহ আশেপাশের এলাকাকে তারা অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও নিজস্ব তৎপরতার সাহায্যে একটা নতুন শহরে রূপ দেয়। একজন নতুন পর্যটক ক্যাম্পগুলো দেখামাত্রই অবাকচিত্তে এটি বলে বসবে যে, এ যেন এক নতুন শহর। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠনগুলো সহ দেশী ও বিদেশী এনজিওগুলোর দিন রাত খাটুনির পর রোহিঙ্গারা এমন অবস্থায় এসে পৌঁছায়। তাদের এমন উন্নত অবস্থা দেখে কিছু বাঙালী স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রতি ইর্ষান্বিতও হয়ে পড়ে। অথচ এক সময় তারাই রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছিলো।
সাম্প্রতিক তাদের এমন অবস্থা দেখে দেশের অনেকেই মনে করছেন, তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু প্রত্যাবাসনের ব্যপারে বাংলাদেশ মায়ানমারের মধ্যে অনেক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হলেও এর কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রত্যাবাসনের জন্য দুইবার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও কোন রোহিঙ্গাকে তাদের দেশে ফিরে যেতে দেখা যায়নি। যার ফলে তাদের এবং একইসাথে সাথে বাঙালীদের ভবিষ্যৎ আরো ঘোলাটে আকার ধারণ করেছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ১৫ই আগস্টের মহাসমাবেশ দেখে বাঙালী জনমনে হতাশা বেড়েছে। সবাই মনে করছে, রোহিঙ্গারা এ দেশে চলে যাওয়ার জন্য আসেনি। তারা যেভাবে বাংলাদেশে গেড়ে বসেছে তাতে মনে হয়না তাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে।
এত সব অস্পষ্টতা আর ঘোলাটে ব্যাপারগুলো কেন হচ্ছে? কেন রোহিঙ্গাদের নিয়ে জনমনে অশান্তি, ক্ষোভ, আশংকা ও হতাশা দিনদিন বাড়ছে? এদের নেপথ্যে কাজ করছে কারা? কাদের প্রভাবের ফলে এরা সবকিছুতে সক্ষম হয়ে উঠছে?
এসবের উত্তর পেতে হলে প্রথমে আমাদেরকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সবার অবস্থান সম্পর্কে জানতে হবে। তাদের ব্যাপারে মায়ানমার, বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের কি ভাবনা আছে সেটা জানতে হবে। সবচে বড় কথা হলো রোহিঙ্গারা কি চায়? তারা কি এ দেশে চিরতরে থেকে যেতে চায়? নাকি স্বদেশে ফিরে যেতে চায়?

মায়ানমারের অবস্থান: রোহিঙ্গাদের ঘিরে মায়ানমারের অবস্থান সবসময় স্পষ্ট ছিলো। তারা এই ইস্যুটিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেদের পূর্বাবস্থানকেই মূলত ধরে রেখেছে। রোহিঙ্গা নিধনে লিপ্ত থাকলেও বিশ্বের দরবারে নিজেদের সাফাই গেয়ে এসেছে। গত তিন শতাব্দি ধরে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস যদি কেউ ভালোভাবে অধ্যয়ন করে তাহলে তার বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়, মায়ানমার সরকার ও জনগন কখনো রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক মনে করেনি। ইসলাম ধর্মের প্রতি ঘৃণা যুগে যুগে যেমন ইহুদী খ্রিষ্টানদের মুসলিমদের বিরোদ্ধে তৎপর রেখেছে তেমনি বর্মি জাতিও রোহিঙ্গাদের কখনো আত্মনির্ভর হতে দেয়নি। রোহিঙ্গারা নিজেদের মানবাধিকারগুলো কখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। কখনো নিজেদের দাবিগুলো মুখ ফুটে বলতে পারেনি। পুরো জাতিটি কখনো শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ কল্পনাও করতে পারেনি।
মায়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গা নিধন ও গণহত্যার ধারাবাহিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে সবার কাছে তাদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যাবে। নিচে সংক্ষিপ্ত রূপে গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরা হলো।
রোহিঙ্গা গণহত্যার সূচনা হয় ১৭৮৪ সালে যখন বর্মি রাজা বোধোপায়া আরাকান দখল করে। রোহিঙ্গাদের সোনালি ইতিহাস মুছে ফেলার ক্ষত্রে বোধোপায়াই সর্বপ্রথম অবদান রাখে। তার শাসনামলে গণহত্যা বড় আকার ধারণ না করলেও সে গণহত্যার দার উন্মোচন করে।
বৃটিশরা ভারত উপমহাদেশ ত্যাগ করার পর ১৯৪২ সালের মার্চের শেষ থেকে মে পর্যন্ত অফিসিয়ালি রোহিঙ্গা নিধনের কাজ শুরু হয়। বর্মি সরকার তখন রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করে।
১৯৪৯ সালে বর্মি সরকার গণহত্যার সুচনা ঘটায়। এবার তারা নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। এতে অনেক রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয় এবং ২০০০০ এরও বেশি রোহিঙ্গা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়ে পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়।
১৯৫৮ সালে বৌদ্ধরা মুসলিমদের মসজিদগুলো বন্ধ করে সেগুলোকে বর্মি সেনানিবাসে রূপ দেয়।
১৯৭৯ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশকে তারা মানবাধিকার লংঘনকারী সকল প্রকার শাস্তি দেয়। এতে বাধ্য হয়ে অনেক রোহিঙ্গা পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে পাড়ি জমায়।
১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের সম্মান ও সম্পদ হরণের মাধ্যমে বর্মি সরকার আবারো নিধন কাজ শুরু করে। এবার প্রায় ১০০০০ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় এবং তিন লাখেরও বেশি মানুষ পাশ্ববর্তি দেশগুলোতে আশ্রয় নেয় যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশে পাড়ি জমায়।
২০১২ সালে এসে রোহিঙ্গা গণহত্যা আরো বড় আকার ধারণ করে। এবারের গণহত্যা পুরো এক বছড় জুড়ে চলতে থাকে। এই গণহত্যায় ১০০০০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মায়ানমারের বৌদ্ধদের হাতে নিহত হয়, ৪০০০ হাজারেরও বেশি মানুষ নদীপথে পার হতে গিয়ে ডুবে মারা যায়, ৫৩৩০ জন কারাবন্দী হয়, ১২০০ জনের বিক্রি সম্পন্ন হয়, ৫৫ জনকে জীবিত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, ৩২০ টি মসজিদ ও ২৪৩ টি মাদ্রাসা ভেঙে দেওয়া হয় এবং ১২২৩ টি মসজিদ ও ৬৪৩ টি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বোপরি ২,২০,০০০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয়।
২০১৬ সালের আগস্টে চিরতরে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বর্মি সরকার। তাদের বিরোদ্ধে অনেকগুলো মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। রাখাইনের কিছু অঞ্চলকে পুরুষশূন্য করে ফেলে। এবার প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় আর এক হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এরপর রোহিঙ্গাদের ইতিহাসে এক কালো রাত ঘনিয়ে আসে। ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট। বিশ্বের ইতিহাসে এক নৃশংসতম দিন। অবশেষে রোহিঙ্গা নিধনের মোটামোটি সব কার্যক্রম সেরে ফেলে বর্মি সরকার। এরপর থেকে রোহিঙ্গা নিধনের জন্য তাদের আর কোনো সময় যেন বের করতে না হয়। কারণ এবারের গণহত্যায় মায়ানমারে আর কোনো রোহিঙ্গা অবশিষ্ট নেই। রোহিঙ্গাদের সমূলে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছে বর্মি সরকার। এখন রাখাইন রাজ্যে পড়ে আছে শুধু রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে ফেলা ঘরবাড়ি ও শষ্যক্ষেত্র। এবার ১০০০০ হাজার রোহিঙ্গাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আর বাংলাদেশে এসে পাড়ি জমায় প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। (আসাদ পারভেজ, নাফ নদীর ওপারে, প্রথম সংস্করণ, (ঢাকাঃ গার্ডিয়ান প্রকাশনী, ২০১৮ খ্রি), পৃঃ ১৫-১৭)
রোহিঙ্গা নিধনের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস কেউ পড়লে মায়ানমারের অবস্থান তার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। মায়ানমার কখনো রোহিঙ্গাদের নিজেদের মনে করেনি এবং সবসময় তাদের বিতাড়িত করার চেষ্টা করেছে। বৈশ্বিক চাপের মুখে পড়ে তারা বাংলাদেশের সাথে প্রত্যাবাসন নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেছে। কিন্তু এই আলোচনা রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। কারণ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হলেও তারা তাদের স্বদেশকে নিজেদের করে নিতে পারবেনা। কারণ মায়ানমার তাদেরকে শুধুমাত্র শরণার্থী হিসেবে নিতে রাজি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা দিতে তারা কখনো রাজি ছিলোনা বা হবেনা। এতে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলদেশের অবস্থান: রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ কখনো শক্ত অবস্থানে যেতে পারেনি। অর্থনৈতিক আর সামরিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অন্যের কথা মত চলতে বাধ্য ছিলো। পাশাপাশি মানবিক দরদ, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব আর ভাষাগত ও ধর্মগত মিল তাদেরকে আরো দুর্বল করে রেখেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাঙালীদের মধ্যে দুই ধরনের লোক পাওয়া যায়। একদল চায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা জরুরী। নইলে বাংলাদেশ হুমকির মুখে পড়বে। তারা হলো দেশের সচেতন মহল। তারা মনে করে, রোহিঙ্গারা আসার কারণে বাঙালীরা অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে উখিয়ার স্থানীয়রা ও স্থানীয় ব্যাবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। রোহিঙ্গারা যে এরিয়াগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে সেগুলো এক সময় ঘন বন জঙ্গল দিয়ে আচ্ছাদিত ছিলো। রোহিঙ্গারা আসার কারণে সেসব স্থানের পরিবেশ এখন সামান্য হলেও দূষিত হয়েছে।
রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীদের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের ভিতর কাঁচামালের ব্যবসা স্থাপন করেছে। কাঁচামালের পণ্যগুলো তারা অবৈধভাবে এনে সেখানে সস্তা দামে বিক্রি করে। সেই পণ্যগুলো উখিয়া থেকে শুরু করে মোটামুটি বাংলাদেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। বাঙ্গালীরা সেগুলো সস্তাতে কিনে নেয় এবং দেশীয় পণ্যগুলো এড়িয়ে যায়। ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ে যায়।
পাশাপাশি, অশিক্ষিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গারা যেকোনো অপরাধ করতে দ্বিধা করেনা। এপর্যন্ত চুরি, ডাকাতি ও খুন করা সহ অনেক অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়েছে। তাদের অপরাধমূলক আচরণের কারণে এলাকার মানুষদের জীবনে দূরাবস্থা নেমে আসে।
এসব কারণে দেশের সচেতন মহল মনে করে, তাদের প্রত্যাবাসন দ্রুত করা উচিৎ। নইলে বাংলাদেশকে অনেক বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।
এদেশের আরেক দল মনে করে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হলে বরং তাদের লাভ। এদের অন্যতম হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে চাকরিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা। কারণ তাদের মধ্যে সবসময় প্রত্যাবাসনের কারণে চাকরিচ্যুত হওয়ার ভয় কাজ করে। এটা সত্য যে, এদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের হাজারো বেকারের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেয়। আর এক্ষেত্রে দেশী ও বিদেশী এনজিওগুলো প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। ক্যাম্পে চাকরির বেতন দ্বিগুণ হওয়ায় অনেক সরকারী ও বেসরকারী কর্মকর্তা তাদের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে চাকরি শুরু করে। পাশাপাশি এনজিওগুলোও তাদের ফান্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকায় রোহিঙ্গাদের এদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার স্বপ্ন লালন করে।
তাছাড়া বাঙালী কিছু ব্যবসায়ীও চায়না, রোহিঙ্গারা এদেশ থেকে চলে যাক। কারণ তাদের ব্যবসার মূল হাতিয়ার হলো রোহিঙ্গা। অনেকেই রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা ব্যাবসা সেগুলোর অন্যতম।

সুতরাং, বাংলাদেশ সরকার চাইলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হচ্ছেনা। কারণ বেকারত্ব প্রবণ একটি দেশের বেকাররা যখন চায়না, রোহিঙ্গারা এখান থেকে চলে যাক তখন সরকারের পক্ষেও খুব বেশি কিছু করার থাকে বলে মনে হয় না। কারণ বেকারত্ব দূর করতে যেখানে সরকারকে অনেক বছর ধরে হুমড়ি খেতে হচ্ছে সেখানে মূহুর্তেই হাজারো বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। হয়তো এটার কারণে বাংলাদেশ সরকারও চাইবেনা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হোক।

জাতিসংঘের অবস্থান: পৃথিবীতে অবস্থানরত অধিকাংশ রোহিঙ্গা শিবিরকে নিয়ন্ত্রণ করছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংগঠন (UNHCR)। এক্ষেত্রে তারাই শরণার্থীদের ব্যাপারে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু তারা এখানে এসে নিজেদের মিশনারী উদ্দেশ্যগুলোকে প্রাধান্য দেয়। তারা চাইলেই জাতিসংঘের সাহায্য নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে। নিচে তাদের ক্ষমতার কিছু

সংক্ষিপ্ত উদাহরণ দেওয়া হলো: 
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত জাতি সংঘ ৭০ টি যুদ্ধমিশনে নিজেদেরকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। তন্মধ্যে ৫৪ টি মিশনে দু পক্ষের মাঝে বিরাজমান যুদ্ধ ও সহিংসতার নিষ্পত্তিতে অবদান রেখেছে। আর বাকি ১৪ টি এখনো বিদ্যমান। আর এইজন্য তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীকে ১৯৮৮ সালে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়।
১৯৪৭-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত একটা স্বাধীন শহর ছিলো টরেস্টা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এটা ছিলো অস্ট্রিয়া নিয়ন্ত্রিত। পরে এই শহরটিকে ইতালি নিয়ন্ত্রনে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনী দ্বারা এই শহরটিকে সম্পূর্ণভাবে তাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে এবং এটিকে স্বাধীন বলে ঘোষনা দেয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘই ছিলো এই শহরটির নিয়ন্ত্রক। পরবর্তিতে তা ইতালি আর যুগোস্লাভিয়ার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
২০০৬ সালে লেবানন আর ইজরাইলের মধ্যে ৩৪ দিন ব্যাপি চলতে থাকা যুদ্ধের নিষ্পত্তি ঘটে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের ফলে।
১৯৫০ সালে যখন উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করে তখন জাতিসংঘ এতে হস্তক্ষেপ করে। তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনী এই ভয়াবহ যুদ্ধ সাময়িক স্থগিত করতে সক্ষম হয় এবং উত্তর কোরিয়াকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।
১৯৪৮ সালের ২৯ মে আরব আর ইজরাইলের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অবদানটা কম ছিলোনা। এমনকি তাদের অনেকেই সেই যুদ্ধে নিহতও হয়েছিল। এই দিনটিকে “ International Day of United Nations Peacekeepers” (আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী দিবস) হিসেবে ঘোষনা দেওয়া হয়।
তাছাড়া জাতিসংঘের কড়া নজরদারীর কারণে ১৯৪৭ সালের যুদ্ধের পর ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান অনেক লম্বা সময় ধরে যুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি। পাশাপাশি আফ্রিকায়ও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের ফলে অনেক গৃহযুদ্ধ ও সহিংসতা বন্ধ হয়ে যায়।
লিংকঃ https://en.m.wikipedia.org/wiki/History_of_United_Nations_peacekeeping
এত উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে জাতিসংঘের অবস্থান স্পষ্ট করা। তারা চাইলেই অল্প সময়েই রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভিটেমাটি, ঘর ও দেশ ফিরিয়ে দেওয়া সহ সকল প্রকারের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এটা তাদের জন্য কোনো ব্যাপার নয়। যেখানে তারা বিশ্বের এত ভয়াবহ যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও সহিংসতা বন্ধ করতে পেরেছে সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুটির নিষ্পত্তি ঘটানো তো তাদের জন্য বাম হাতের খেল।
তবে কি তারা চায়না রোহিঙ্গারা তাদের স্বদেশে নিজেদের সব অধিকারগুলো নিশ্চিত করে ফিরে যাক? তারা কি চায়না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগনের মনে স্বস্তি ফিরে আসুক? নাকি এটা না হওয়ার পেছনে তাদের অন্য কোন মিশনারি উদ্দেশ্য আছে?
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশ নতুন নয়। সেই ১৯৭০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে এক মিলিয়নে। জাতিসংঘ তখন থেকেই বাংলাদেশে তাদের স্বাধারণ জীবন যাপন নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে আসছে। শুধুমাত্র তাদের খাদ্য নিশ্চিত করতে জনপ্রতি মাসে ৭৭০ টাকা করে কমপক্ষে দশ লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য মাসে ব্যয় করে ৭৭ কোটি টাকা। তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সহ সব ধরণের সাধারণ মানবাধিকার নিশ্চিত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বাংলাদেশ প্রশাসনের সাহায্য ও সমর্থন নিয়ে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের সব ধরণের ভয়ভীতি ছাড়া সাধারণ জীবন যাপন নিশ্চিত করতে পেরেছে।
এর মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে এটা স্পষ্ট হয় যে, তাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনার হার দিনদিন কমছে। রোহিঙ্গারা জাতিসংঘ থেকে আশাতীত সাহায্য পেয়ে ইতিমধ্যেই ভুলতে বসেছে যে, তারা রোহিঙ্গা। তারা এখন নিজেদেরকে বাঙালী বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। জীবন যাপনের মানকে তারা যেভাবে ধারাবাহিকভাবে উন্নিত করছে তাতে মনে হবে, তারা বাঙালী জাতির চাইতে অধিক স্মার্ট।
এসবের দায় কি জাতিসংঘ এড়াতে পারবে?

রোহিঙ্গাদের অবস্থান: রোহিঙ্গারা অশিক্ষিত হওয়ায় নিজেদের ব্যাপারে এতটা উদাসীন যে তাদের অবস্থান বুঝাটা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ইচ্ছা, আকাংখার সবই নদীর স্রোত ও বাতাসের প্রবাহের সাথে চলতে থাকে। সেই স্রোত কিংবা প্রবাহ হলো বৈশ্বিক রাজনীতি বা মিশনারী তৎপরতা যা তাদেরকে যুগ যুগ ধরে বলির পাঠা করে রেখেছে। তারা সম্পূর্ণ সুবিধা নির্ভর জাতি। তাদেরকে যারাই সুবিধা দিবে তারা তাদেরই অবনত হয়ে কাজ করবে।
তারা কখনো কল্পনাও করেনি, বাংলাদেশে এমন সুব্যবস্থা পাবে। বাংলাদেশি মানুষগুলো তাদের দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করবে। বিভিন্ন দেশীয় ও বিদেশী এনজিওগুলো তাদের জন্য বিরতিহীন কাজ করে যাবে। বছর খানেকের মধ্যে তাদের অবস্থা যখন স্বাভাবিক হয়ে উঠে তখন তারা নিজেদেরকে বাংলাদেশীদের মত ভাবা শুরু করে। তারা নিজেদের ভাগ্যকে বাংলাদেশের সাথে মিলিয়ে নেয়।
তবে তাদের মধ্যে যারা সচেতন ও শিক্ষিত তারা কখনো অন্যের দেশে পরাধীন হয়ে থাকতে চায়নি। তারা সবসময় নিজেদেরকে স্বাধিকারের ব্যাপারে সচেতন হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। তাদের মনে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেটা মুখ ফুটে বলতে পারেনা। অবশেষে সেই ইচ্ছার বহিপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি ২৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া তাদের মহাসমাবেশে। অনেকেই তাদের সমাবেশকে উসকানিমূলক হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও বস্তুত এই সমাবেশের মাধ্যমে তারা তাদের অধিকার আদায়ের জোর দাবির জানান দেয়। সমাবেশে নেতৃত্ব দেয়া মুহিব্বুল্লার একটি ভিডিউবার্তা ও সমাবেশে পেশকৃত দাবিগুলো সেটার প্রমাণ বহন করে। মুহিব্বুল্লাহ তার ভিডিউতে স্পষ্ট করে বলেছে যে, রোহিঙ্গারা এদেশের মানুষের ক্ষতি করতে আসেনি। তাদের সমাবেশটি কোনোমতেই সেটার ইঙ্গিত বহন করেনা। বরং তারা এই সমাবেশের মাধ্যমে এটার জানান দেয় যে, তারা কোনো দেশেই পরাধীন হয়ে থাকতে চায়না। তারা তাদের স্বদেশে সব অধিকার নিশ্চিত করে ফিরে যেতে চায়। আর এইজন্য তারা সমাবেশ পরবর্তি আল্লার কাছে দুহাত তুলে মুনাজাত করে।
ভিডিও লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=BSaRtaUmi7w&t=20s
তারা এই সমাবেশে মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার যে ছয়দফা দাবি পেশ করেছে সেগুলো হলোঃ
আরাকানে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। ‘সেফ জোন তথা নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের আগে আরাকানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পর্যবেক্ষণ অফিস খুলতে হবে।
প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের উপর আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি-আরসা’র তকমা লাগানো যাবে না।
প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের উপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করতে হবে।

একজন সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী মানুষ এই দাবিগুলো পড়া মাত্রই সে কখনো বলবেনা যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে চিরস্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই দাবিগুলোর মর্মকথা হলো, রোহিঙ্গারা তাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করেই মায়ানমারে ফিরতে চায়। তারা পরাধীন হয়ে থাকতে চায়না। আর এই দাবিগুলো মায়ানমার কখনো মানবেনা। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটা স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।

উপসংহার: আগেই বলেছি রোহিঙ্গারা বৈশ্বিক রাজনীতির বলির পাঠা। তাদের ইচ্ছা, আকাংখার সবই নদীর স্রোত ও বাতাসের প্রবাহের সাথে চলতে থাকে। সেই স্রোত কিংবা প্রবাহ হলো বৈশ্বিক রাজনীতি বা মিশনারী তৎপরতা যা তাদেরকে যুগ যুগ ধরে বলির পাঠা করে রেখেছে। তারা সম্পূর্ণ অন্যের দেওয়া সুবিধা নির্ভর জাতি। তাদেরকে যারা সুবিধা দিবে তারা তাদের অবনত হয়ে কাজ করবে।
তাদের এই দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরা যতটুকু দায়ী তার চেয়ে অধিকতর দায়ী হচ্ছে তাদেরকে নিয়ন্ত্রন করা অন্যান্য জাতি ও মানবাধিকার সংঘঠনগুলো। প্রত্যেকেরই কম বেশি দায় আছে তাদের অধপতনের পেছনে।
রোহিঙ্গারা এখনো পর্যন্ত তাদের নেতৃত্বদানকারী কোনো নেতা তৈরী করতে পারেনি। যাদেরকে তারা নেতা হিসেবে চিনে তারা যেকোনোভাবে অন্যের দ্বারা পরিচালিত কিংবা তারা স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এখন বিলাসবহুল জীবন নিয়ে ব্যস্ত। পাশাপাশি গোটা জাতি অশিক্ষিত হওয়ায় তাদের পক্ষ থেকে যে ভবিষ্যতে কোনো নেতার উদয় হবেনা সেটা সহজে অনুমান করে বলে যায়।
অন্যদিকে মায়ানমারের মানবতাহীন ও নিষ্ঠোর আচরণ রোহিঙ্গাদের ভাগ্যকে আরো মেঘাচ্ছন্ন করে রেখেছে। তাছাড়া, অন্যান্য সব জাতি ও মানবাধিকার সংঘটনগুলো নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধ করার জন্য রোহিঙ্গাদের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে।
সুতরাং, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত ভাগ্যে কি লেখা আছে তা শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা।

 

লেখক: মোহাম্মদ আম্মার জাকারিয়া,
ধর্মীয় শিক্ষক,
আই আই ইউ সি স্কুল এন্ড কলেজ, চট্টগ্রাম।

(বিঃ দ্রঃ ‘পাঠকের কলাম’ বিভাগ-এ প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব রাইজিং কক্স ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য রাইজিং কক্স কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।